Showing posts with label বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব. Show all posts
Showing posts with label বিখ্যাত ব্যাক্তিত্ব. Show all posts

14 May 2017

কুমিল্লার কৃতি সন্তান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

কুমিল্লার কৃতি সন্তান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

কুমিল্লার কৃতি সন্তান অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লা জেলার দেবিদ্বার থানার এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেনতার পিতা স্কুল শিক্ষক আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূইয়া, মা আফজারুন্নেছা

মোজাফফর আহমদ হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজ ইনস্টিটিউশন, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পড়াশোনা করেনপরবর্তী পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ইউনেস্কোর ডিপ্লোমা লাভ করেনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই কৃতী ছাত্র দীর্ঘদিন বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে [১৯৫২-১৯৫৪] অধ্যাপনা করেন

মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ১৯৩৭ সালে১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন১৯৫৪ সালে চাকরি ছেড়ে পুরোপুরিভাবে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করেন১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন

১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করেএমনকি তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হয়তিনি আত্দগোপন অবস্থায় আইয়ুবী শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেনআট বছর আত্দগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে তিনি আবার ফিরে আসেন১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হনতিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন১৯৬৯-এ আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেনতিনি আইয়ুব খান আহূত রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন

১৯৭১-এর স্বাধীনতা সংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন এবং প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেনতিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেনওই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেনমুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিসি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গঠনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়১৯৭৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি এবং প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেনস্বৈরাচারী এরশাদ-বিরোধী আন্দোলনের শুরুতে কারারুদ্ধ হনতিনি যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ফ্রান্স, কানাডা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, বুলগেরিয়া, অস্ট্রিয়া, ভারত, দক্ষিণ ইয়মেন, লিবিয়া, আফগানিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ পূর্ব ও পশ্চিম ইউরোপের বহু দেশ সফর করেনতিনি 'সমাজতন্ত্র কি এবং কেন', 'প্রকৃত গণতন্ত্র তথা সমাজতন্ত্র সম্পর্কে জানার কথা', 'মার্ঙ্বাদী সমাজতন্ত্র ও কিছু কথা' বইয়ের রচয়িতাঘটনাবহুল বিশ্বব্যবস্থায় তার রাজনৈতিক দর্শন ও দূরদর্শিতা বাস্তবানুগ ও সময়োপযোগী বলে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে প্রমাণিত হয়েছেবর্তমানে তার গবেষণার বিষয় নতুন শতাব্দীতে নতুন সভ্যতা জন্ম নিচ্ছে যার প্রসব বেদনা শুরু হয়েছে রাশিয়ায় এবং ব্যথা ছড়াচ্ছে অন্যান্য দেশসহ আমাদের দেশেওদেশপ্রেমিক কর্মী সৃষ্টির জন্য মদনপুরে তার প্রতিষ্ঠিত উপমহাদেশের একমাত্র শিক্ষায়তন 'সামাজিক বিজ্ঞান পরিষদ'ব্যক্তিগত জীবনে একমাত্র কন্যাসন্তানের জনকতার সহধর্মিণী মিসেস আমিনা আহমদ ন্যাপের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও বাংলাদেশ নারী সমিতির সভানেত্রী

সূত্রঃ বাংলাদেশ প্রতিদিন 

22 April 2017

কুমিল্লার কৃতি সন্তান কিংবদন্তি শিল্পী লাকী আখন্দ আর নেই

কুমিল্লার কৃতি সন্তান কিংবদন্তি শিল্পী লাকী আখন্দ আর নেই

লাকী আখন্দ

বাংলাদেশের কিংবদন্তি সংগীতজ্ঞ, আধুনিক বাংলা গানের অবিস্মরনীয় পরিচালক, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা লাকী আখন্দ(৬১) আর নেই। তিনি শুক্রবার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬ টায় আরমানিটোলার নিজ বাসায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরন করেছেন। কিংবদন্তি সঙ্গীত শিল্পী লাকি আখন্দ কুমিল্লার সন্তান হলেও পরিচিতি পেয়েছেন ঢাকা’র।
লাকী আখন্দ কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার ফতেহাবাদ ইউনিয়নের খলিলপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত আখন্দ পরিবারে সঙ্গীতপ্রেমী এ,কে, আব্দুল হক আখন্দ ও নূরজাহান বেগম আখন্দ’র দ্বিতীয় সন্তান। তিনি ১৯৫৬ সালের ১৮ জুন জন্মগ্রহন করেন। পিতা আব্দুল হক আখন্দ জনসংযোগ অধিদপ্তরের উচ্চ পদস্ত কর্মকর্তা ছিলেন। পিতার চাকরি করার সুবাদে পুরানো ঢাকার আরমানিটোলার আগামসি লেনের বাড়িতে কেটেছে তার সারা জীবন।
মাঝে মাঝে গ্রামের বাড়িতে আসতেন জমি জমার হিসেব কিাশ এবং স্বজনদের দাওয়াত রক্ষায়। বাড়ির পাশের গোমতী নদীতে মাছ ধরতেন। গ্রামের বাড়িতে এ গর্বিত শিল্পীর আগমনের সংবাদে এলাকার লোকজন ছুটে আসতেন। বায়না ধরতেন গানের। তিনি বাড়ির উঠুনে মাদুর বিছিয়ে রাত জেগে ক্লান্তিহীন ভাবে গান গেয়ে সবার মনোরঞ্জন করতেন। গ্রামের ছেলেদের আয়োজনে পালাগান, যাত্রাগান তিনি সবার সাথে রাত জেগে উপভোগ করতেন। তার পরও প্রচারবিমূখ এ শিল্পীকে দেবীদ্বার কেন কুমিল্লার অনেকেই জানেননা, সে কুমিল্লার দেবীদ্বারের সন্তান। এর দায় ভার যেমন নিজ পরিবারের তেমনি কুমিল্লা ও দেবীদ্বারের রাজনীতিক, সাংবাদিক ও সুশিল সমাজের।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে পেটের পীড়া নিয়ে মেডিকেল চেকআপ করাতে গেলে তার ফুসফুসে সংক্রমণ ধরা পড়ে। তখন বিএসএমএমইউর চিকিৎসকরা তাকে জানান, তিনি ফুসফুস ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছেন। এরপর শিল্পীকে উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়ে যাওয়া হয় থাইল্যান্ডে। ছয় মাসের চিকিৎসা শেষে থাইল্যান্ডের ব্যাংকক থেকে ২০১৬ সালের ২৫ মার্চ দেশে ফেরেন তিনি। সেখানে কেমোথেরাপি নেওয়ার পর শারীরিক অবস্থার অনেকটা উন্নতি হয়েছিল তার। একই বছরের জুনে আবারও থেরাপির জন্য ব্যাংকক যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে পরে আর তার সেখানে যাওয়া হয়ে উঠেনি।

অসুস্থতার প্রথম থেকেই লাকী আখন্দ ও তার পরিবার কোনও রকম আর্থিক সহযোগিতা গ্রহণের বিষয়ে বেশ কঠোর ছিলেন। দেশের শীর্ষ শিল্পীদের উদ্যোগে সহযোগিতা করতে চাইলেও বিনয়ের সঙ্গে লাকী আখন্দ সেটি গ্রহণে অনাগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। অভিমানী এই মানুষটি অন্যের সাহায্য-সহযোগিতায় নিজের চিকিৎসা চালাতে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না। তবে ব্যাংককে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় এই সংগীতকারের চিকিৎসার জন্য পাঁচ লাখ টাকা সহায়তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রাষ্ট্রীয় ভালোবাসা হিসেবে সেটি তিনি গ্রহণ করেছেন স্বাচ্ছন্দে। গত শুক্রবার (২১ এপ্রিল) সন্ধ্যা ৬টায় নিজ বাসায় গুরুতর অসুস্থ্য হয়ে পড়লে তাঁকে দ্রুত মিটফোর্ড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় তাঁকে মৃত ঘোষনা করেন। তার মৃত্যু সংবাদে গোটা দেশের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক, সুশীল সমাজ সহ বিভিন্ন মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে।

সংস্কৃতিমনা পরিবারের ছেলে হিসেবে মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই তিনি তার বাবার কাছ থেকে সংগীত বিষয়ে হাতেখড়ি নেন। শিশুশিল্পী হিসেবে গান করেছেন বেতারে। তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত টেলিভিশন এবং রেডিওতে শিশু শিল্পী হিসেবে সংগীত বিষয়ক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন। ১৪ বছর বয়সে এইচ,এম,ভি পাকিস্তানের সুরকার ছিলেন। ১৫ বছর বয়সে দশম শ্রেনীতে পড়াকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতে চলে যান এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে নিয়মিত সঙ্গীত পরিবেশন করেন। ১৬ বছর বয়সে এইচএমভি ভারতের সংগীত পরিচালক হিসেবে পরিচিতি পান। লাকী আখন্দ ও তার ভাই হ্যাপী আখন্দ দুজনেই গিটারকে সঙ্গী করে তাদের কিশোরবেলা ও প্রথম তারুণ্যে মগ্ন ছিলেন। আগামসি লেনে তাদের পাশের বাড়িতেই ছিলেন আরেকটি সংস্কৃতিবান পরিবার। প্রতিবেশি শম্পা রেজা, রিনি রেজা, নিপা রেজা তিন বোনই ছিলেন অভিনয় ও সংগীতের জগতের অধিবাসী। দুই পরিবারের বন্ধুত্বও ছিল জমজমাট। বিশেষ করে প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী শম্পারেজা, লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দের বন্ধুত্ব ছিল সবচেয়ে গভীর। গানে গল্পে সৃজনশীলতায় কাটে তাদের তারুণ্যের সেই দিনগুলো। ১৯৬৯ সালে লাকী আখান্দ পাকিস্তানী আর্ট কাউন্সিল হতে “বাংলা আধুনিক গান” বিভাগে পদক লাভ করেন।
সঙ্গীতপ্রেমী পিতা-মাতার অনুপ্রেঢ়নায় লাকী আখন্দ শিশু বয়সেই সঙ্গীতের বরপুত্র খ্যাতী লাভ করেন। যে গানেই সুর করেছেন, সেই গানটিই কালজয়ী হয়েছে। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের গানের জগতে সত্যিকারভাবে আধুনিকতার ছোঁয়া নিয়ে আসেন লাকী আখন্দ। সেই সময়ের অশান্ত তারুণ্যের প্রেম, বেদনা, হতাশা ও ভালোবাসাকে তিনি যেভাবে সুরে উপস্থাপন করেছিলেন, তা অনন্য। লাকি আখন্দ ১৯৮০ সালে সৈয়দ সালাউদ্দিন জাকী পরিচালিত ঘুড্ডি চলচ্চিত্রের সঙ্গীত পরিচালনা করেন। এই চলচ্চিত্রে হ্যাপী আখন্দের পূর্বের অ্যালবামের “আবার এলো যে সন্ধ্যা” গানটি ব্যবহৃত হয় এবং ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে। আশির দশকের তুমুল জনপ্রিয়তা পান। ১৯৮৪ সালে সারগামের ব্যানারে বের হয় তার প্রথম একক অ্যালবাম ‘লাকী আখন্দ’। এই অ্যালবামের কয়েকটি উল্লেখযোগ্য গান হল “আগে যদি জানতাম”, “আমায় ডেকোনা”, “মামুনিয়া”, “এই নীল মনিহার”, ও “হৃদয় আমার” যে গানগুলো শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেললেও ১৯৮৭ সালে ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের অকাল মৃত্যুর পর দারুনভাবে মুষড়ে পড়েন লাকি আখন্দ, সঙ্গীতাঙ্গন থেকে অনেকটা স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান এই গুণী শিল্পী। পরের বছর আখন্দ সামিনা চৌধুরীর একক অ্যালবাম আমায় ডেকোনার সঙ্গীতায়োজন করেন। এছাড়া তিনি ব্যান্ডদল আর্কের “হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা” গানের সুর করেন। ২০০০ সালের পর তিনি আরেকটি মিশ্র অ্যালবাম তোমার অরণ্যের সুর ও সঙ্গীতায়োজন করে। এতে লাকী আখান্দের কণ্ঠে গাওয়া যা ৩টি গানসহ বাপ্পা মজুমদার, ফাহমিদা নবী, ও নিপুর কণ্ঠে ১০টি গান ছিল। তিনি এই অ্যালবামে সমকালীন তাল, লোক গানের তাল ও তার প্রিয় স্পেনীয় গানের তাল ব্যবহার করেন।
মাঝখানে প্রায় এক দশক নীরব থেকে লাকী আখন্দ ১৯৯৮-এ ‘পরিচয় কবে হবে’ ও ‘বিতৃষ্ণা জীবনে আমার’ অ্যালবাম দুটি নিয়ে আবারও ফিরে আসেন শ্রোতাদের মাঝে। কুমার বিশ্বজিৎ’র কন্ঠে ‘যেখানে সীমান্ত তোমার’, আইয়ুব বাচ্চু’র ‘কি করে বললে তুমি’, হাসান’র ‘হৃদয়ের দুর্দিনে যাচ্ছে খরা’র মতো কালজয়ী গানের সুরারোপ করেন তিনি। ‘লিখতে পারিনা কোন গান আজ তুমি ছাড়া’ ব্যান্ডতারকা জেমস’র এই বিখ্যাত গানটির সুর সংযোজন ও সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন লাকী আখন্দ। তিনি ব্যান্ড দল হ্যাপী টাচ’র সদস্য। তার সংগীতায়জনে করা বিখ্যাত গানের মধ্যে রয়েছে এই নীল মনিহার, আবার এলো যে সন্ধ্যা এবং আমায় ডেকো না। তিনি বাংলাদেশী জাতীয় রেডিও নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ বেতার এর পরিচালক (সংগীত) হিসেবে কাজ করেছেন।
বিতৃষ্ণা জীবনে আমার ছিল ব্যান্ড ও আধুনিক গানের মিশ্র অ্যালবাম। এতে সেসময়ের ছয়জন জনপ্রিয় গায়ক, মাহফুজ আনাম জেমস, আইয়ুব বাচ্চু, হাসান, কুমার বিশ্বজিৎ, তপন চৌধুরী, ও সামিনা চৌধুরী কণ্ঠ দেন। একই বছর তিনি সামিনা চৌধুরীকে নিয়ে আনন্দ চোখ নামে একটি দ্বৈত অ্যালবাম প্রকাশ করেন। গোলাম মোরশেদের গীতে এবং আখান্দের সঙ্গীতায়োজনে অ্যালবামটি প্রকাশ করে সাউন্ডটেক। এতে ১২টি গান ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গান ছিল “কাল কি যে দিন ছিল”, “বলো কে পারে” ও “এই বরষা রাতে”।
‘কবিতা পড়ার প্রহর এসেছে’, ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’, ‘কে বাঁশি বাজায়রে’, ‘স্বাধীনতা তোমাকে নিয়ে’, ‘নীল নীল শাড়ি পড়ে’, ‘পাহাড়ি ঝর্ণা’, ‘হঠাৎ করে বাংলাদেশ’সহ অসংখ্য গানের সুরারোপ ও সঙ্গীতায়োজন করেছেন বাংলা সঙ্গীতের এই কিংবদন্তী শিল্পী। এরপর টেলিভিশনের লাইভ প্রোগ্রামে তাকে দেখা গেছে, মেয়ে মাম্মিন্তিকেও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার উত্তরসূরী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের সঙ্গে। এই নীল মনিহার, আগে যদি জানতাম, নীলা, আমায় ডেকো না এমনি অসংখ্য গান ও সুরের মায়াজাল তিনি সৃষ্টি করেছেন। ১৯৮০ সালে সালাহউদ্দীন জাকী পরিচালিত ‘ঘুড্ডি’ ছবির সংগীত পরিচালনার মাধ্যমে তিনি পালটে দিয়েছিলেন চলচ্চিত্রের গানের ধারা। ‘ঘুড্ডি’ ছবির ‘ঘুম ঘুম চোখে’, ‘সখী চল না’, ‘যেমন নদীর বুকে নাও ভাইসা চলে’ এবং ‘আবার এলো যে সন্ধ্যা’ গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। এই গানগুলোর কথা লিখেছিলেন কাওসার আহমেদ চৌধুরী। কণ্ঠ দিয়েছিলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ, হ্যাপী আখন্দ, শিমূল ইউসুফ, লিনু বিল্লাহ। বিশেষ করে হ্যাপী আখন্দের কণ্ঠে আবার এলো যে সন্ধ্যা গানটি এখন পর্যন্ত বাংলা চলচ্চিত্রের চিরসবুজ গানের তালিকায় রয়েছে।
শুধু চলচ্চিত্রের গানে নয়, স্টেজ শো থেকে শুরু করে টিভি অনুষ্ঠান প্রতিটিতে তিনি শ্রোতাকে দিয়েছেন নতুনত্বের স্বাদ। বাংলা গানের ধারায় প্রথম আধুনিক মিউজিক ইন্সট্রুমেন্ট ব্যবহার করেন তিনি। পাশ্চাত্য ও প্রাচ্যের সংগীতের ধারা ভেঙে তৈরি করেন ফিউশন। আশির দশকে লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ জুটি দারুণ সব গান উপহার দেন শ্রোতাদের। লাকী আখন্দ মূলত ছিলেন সুরকার ও গীতিকার। আর সেই গানের শিল্পী ছিলেন হ্যাপী আখন্দ। আশির দশকে সুবর্ণা মুস্তাফা অভিনীত টিভি নাটকে লাকী আখন্দের গান এই নীল মনি দর্শক শ্রোতাদের মধ্যে দারুণ সাড়া জাগায়। ১৯৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ করে লাকী আখন্দের প্রথম একক অ্যালবাম। অ্যালবামটি প্রকাশিত হয়েছিল সারগামের ব্যানারে। এই অ্যালবামের ‘আমায় ডেকো না’, ‘আগে যদি জানতাম’, ‘মামনিয়া’ ‘এই নীল মনিহার’, ‘সুমনা নামের মেয়েটি’ ‘রূপসী নীল‘ গানগুলো ছিল দুর্দান্ত জনপ্রিয়। তিনি তার সংগীতায়োজনে ড্রাম, ব্যাঞ্জো, ইত্যাদি যন্ত্র ব্যবহার করে পাশ্চাত্যের পপ মিউজিকের আমেজ নিয়ে আাসেন।
১৯৭৫ সালে লাকী আখান্দ তাঁর ছোট ভাই হ্যাপী আখন্দের একটি অ্যালবামের সঙ্গীতায়োজনই করেননি তিনি একাধারে আধুনিক গান, সফট-মেলোডি, মেলো-রক, হার্ড-রক, গীতিকার, সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক সমাদৃত ছিলেন। তার অ্যালবামের তালিকা,-লাকী আখন্দ (১৯৮৪), পরিচয় কবে হবে (১৯৯৮), বিতৃষ্ণা জীবনে আমার (১৯৯৮), আনন্দ চোখ (১৯৯৯), আমায় ডেকোনা (১৯৯৯), দেখা হবে বন্ধু (১৯৯৯), তোমার অরণ্যে (২০০১) উল্লেখযোগ্য।
লাকি আখন্দের গোটা পরিবারই সঙ্গীত প্রেমী ছিলেন। ৪ ভাই সেলি আখন্দ, লাকি আখন্দ, জলি আখন্দ এবং হ্যাপী আখন্দ ও এক মাত্র বোন জেসমিন আখন্দ। লাকি আখন্দের ৪ ভাই-ই পরপাড়ে। বেঁচে আছেন এক মাত্র বোন জেসমিন আখন্দ, (প্রথম স্ত্রী নারগিস আখন্দের সাথে ২০০৮ সালে বিচ্ছেদ হয়ে যায় তার গর্ভের) এক মাত্র কণ্যা সঙ্গীত শিল্পী মাম্মিন্তি(২২) ও (দ্বিতীয়) স্ত্রী মরিয়ম আখন্দ এবং তার গর্ভের সাড়ে ৩ বছরের একমাত্র পুত্র সন্তান সভ্যতারা আখন্দ।

07 March 2017

চিত্রশিল্পী মাসুক হেলাল

চিত্রশিল্পী মাসুক হেলাল


মাসুক হেলালের জন্ম ১৯৬২ সালের ২ ফেব্রুয়ারী কুমিল্লার বড়ুরা থানার গোহালিয়ায় পড়াশুনা করেছেন কুমিল্লা কোটবাড়ির ল্যাবরেটরী স্কুলে। পরবর্তীতে চিত্রকলা নিয়ে ঢাকা চারুকলায় পড়াশুনা করেছেন।
পেশা জীবনের শুরু হয় সংবাদ পত্রিকায় ১৯৮২ সালে। এরপরে ইত্তেফাকে, বিচিত্রা এবং বিচিন্তায় কাজ করেছেন। পরে জনকণ্ঠে কাজ করেছেন বহুদিন। বর্তমানে প্রথম আলোয় সিনিয়র শিল্পী হিসেবে কাজ করছেন।

06 March 2017

ভারতখ্যাত কুমিল্লার গীতিকার ও সুরকাররা

ভারতখ্যাত কুমিল্লার গীতিকার ও সুরকাররা


আধুনিক বাংলা গানের ইতিহাস দীর্ঘ এবং অনন্য আলোয় উদ্ভাসিত। এই শুভসূচনার জনক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। পরবর্তীকালে অর্থাৎ তিরিশের দশকে চলচ্চিত্র এসে এই আধুনিকতাকে এমন পর্যায়ে নিয়ে এসেছে যাকে ধুন্ধুমার কাণ্ড বলতে হবে! কথায়, যন্ত্রে আর সুরের আলোকে এমন সব গান সৃজন করেছেন রবীন্দ্র-পরবর্তী একদল গীতিকার, সুরকার ও কন্ঠশিল্পী মিলে, যা একটি সুদীর্ঘ সোনালি যুগ ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাসে।

বিশেষ করে চলচ্চিত্রের জন্য লিখিত গানগুলো এমন একদল সৃজনপাগল প্রতিভাধরদের সময়কে ধারণ করে আছে যা উত্তরকালে আমাদের বড় বেশি স্মৃতিকাতরায় অস্থির করে তোলে, সেই সব গান শুনে আবেগে আপ্লুত হই আজও। একসময় আবার চলচ্চিত্রের বাইরেও একটি রীতি হিসেবে গড়ে ওঠে যেমন দুর্গাপূজার সময় আধুনিক গান রচনা করা। আশির দশক পর্যন্ত শ্রোতারা অধীর প্রতীক্ষায় থাকতেন কলকাতার বাৎসরিক পূজার গান কার কেমন হবে শোনার জন্য!

১৯৩১ সালে ভারতে সবাক্ চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হলে পরে ১৯৩২ সালেই হিন্দুস্থান ও মেঘাফোন রেকর্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠালাভ করে। ১৯৩৫ সালে সেনোলা কোম্পানি। আবার ১৯৩৫ সালেই প্রথম প্লে-ব্যাক প্রথা চালু হয় ‘ভাগ্যচক্র’ চলচ্চিত্র দিয়ে। এর সফল উদ্যোক্তা ছিলেন নীতিন বসু, হীরেন বসু ও পঙ্কজ মল্লিক। প্রথম গানটি ছিল ‘মোরা পুলক যাচি তবু সুখ না মানি’। কন্ঠ দিয়েছিলেন পঙ্কজ মল্লিক ও সুপ্রভা (ঘোষ) সরকার। এই সময় আরও অনেক খ্যাতিমান কন্ঠশিল্পী ও অভিনয়শিল্পী ছিলেন যেমন কানন দেবী, কেএল সায়গল, কমলা ঝরিয়া, মানিকমালা, হরিমতী, যূথিকা রায়, বিনয় গোস্বামী, পাহাড়ি সান্যাল, কৃষ্ণচন্দ্র দে, বীণাপানি, পূর্ণিমা, শৈলদেবী, প্রমথেশ বড়ুয়া, ছায়াদেবী প্রমুখ।

বিশ শতকের প্রথম দিকে সাধারণত বাংলা গান ছিল রবীন্দ্রসঙ্গীত, দ্বীজেন্দ্রগীতি, অতুলপ্রসাদ, রজনীকান্ত তথা ভক্তিগীতি, কীর্তন, ভজন, টপ্পা প্রভৃতি। সবাক্ চলচ্চিত্র ও গ্রামোফোন কোম্পানির আত্মপ্রকাশের ফলে তিরিশ দশকের মধ্যভাগ থেকে বাংলা গানের ক্ষেত্রে একটি নতুন জোয়ার আসে। অনেক তরুণ আধুনিক গীতিকার ও সুরকারের আবির্ভাব ঘটে। শ্যামাসঙ্গীত ও ইসলামি গানেরও সূত্রপাত এই সময় থেকেই। আধুনিক গান বলতে যা বোঝায় তার শুরু হয়েছিল বাংলা গানের সুরের জগতের বিস্ময়কর প্রতিভাধর দিকপাল কমল দাশগুপ্তর সুরে যূথিকা রায়ের কন্ঠে গীত ‘আমি ভোরের যূথিকা’গানটি দিয়ে ১৯৩৪ সালে, তখন গায়িকার বয়স মাত্র চৌদ্দ আর গানটি লিখেছিলেন জমিদারপুত্র প্রণব রায়।

উল্লেখ্য যে, যাশোহরের সন্তান কমল দাশগুপ্ত পিতার ব্যবসার সুবাদে কয়েক বছর পরিবারের সঙ্গে কুমিল্লায় ছিলেন, ভিক্টোরিয়া কলেজে পড়ালেখা করেছেন। তখন শচীন দেবদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল কিনা জানি না।

সেই আধুনিক বাংলা গানের মধ্যগগনে অর্থাৎ তিরিশ-চল্লিশ দশকে বাংলা গানে আধুনিকতার আলো যাঁরা জ্বেলেছিলেন তাঁদের মধ্যে প্রথম সারির যে কয়েক জন ছিলেন তাঁদের মধ্যে তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্য তথা কুমিল্লার কতিপয় প্রতিভাধরও অসামান্য ইতিহাস সৃষ্ট করে গেছেন। যা সত্যি অভাবনীয়! তাঁরা হলেন অসাধারণ মেধাবী সঙ্গীতজ্ঞ সুরকার শচীন দেববর্মণ (১৯০৬-১৯৭৫), সুরসাগর হিমাংশু দত্ত (১৯০৮-১৯৪৪) এবং গীতিকার অজয় ভট্টাচার্য (১৯০৬-১৯৪৩) ও সুবোধ পুরকায়স্থ (১৯০৭-১৯৮৪)।

এঁরা যেমন ভারতীয় ধ্রুপদী রাগসঙ্গীত এবং বিদেশি যন্ত্রসঙ্গীতযোগে আধুনিক গান সৃজন করেছেন, তেমনি আবহমান কালের গ্রামীণ সুরধারা যেমন পদাবলি, পল্লীগীতি, ভাওয়াইয়া, মারফতি, বাউল প্রভৃতি নিয়েও কাজ করেছেন। বিদেশি বাদ্যযন্ত্রসমেত নানা রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষাও করেছেন। শচীনকর্তা তো বোম্বের হিন্দিভাষী চলচ্চিত্রে সমতটের পাগলপারা বিরহী বাঁশির সুর, নদীর বর্ষামদির কলতান ব্যবহার করে চমকে দিয়েছেন! হিন্দি চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গীতধারাকেই পাল্টে দিয়েছেন। তাঁদের লিখিত ও সুরারোপিত অসংখ্য গান চিরকালের গান হিসেবে আজও লোকপ্রিয়, অনুকরণীয়, ভবিষ্যতেও তাই থাকবে। একইভাবে তাঁর সুযোগ্য পুত্র পঞ্চম তথা রাহুল দেব বর্মণও বাবার মতোই আজ কিংবদন্তি।

সেই তুলনায় হিমাংশু দত্ত বোম্বে না যাওয়ার কারণে পিছিয়ে পড়েছিলেন সত্য কিন্তু বাংলা গানের জগতে এক উজ্জ্বল সুরজ্যোতিষ্ক হয়ে আছেন এবং থাকবেন। অন্যদিকে বরাবরই আড়ালে থাকা গীতিকারদের মধ্যে অজয় ভট্টাচার্য এবং সুবোধ পুরকায়স্থ যেন বিস্মৃতির আড়ালেই চলে গেছেন।

শচীনদেবকে নিয়ে যত লেখালেখি ও গ্রন্থাদি রচিত হয়েছে তার তুলনায় হিমাংশু, অজয় ও সুবোধকে নিয়ে তেমনটি হয়নি বললেই চলে। ফলে তাঁদের সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য বিস্তারিত তথ্যাদি জানা বড়ই দুষ্কর। সেরকম প্রবীণ সহযোগী, সহপাঠী কিংবা সতীর্থও নেই যাঁদের কাছে তাঁদের সম্পর্কে শোনা বা জানা যাবে। তবে যতখানি জানা যায় সুরকার ও গীতিকার হিসেবে তাঁদের অবদান কুমিল্লাবাসীকে গৌরবান্বিত করে রেখেছে।

স্বদেশী আন্দোলনে উন্মাতাল সেই অস্থির সময়টায় যে সকল গীতিকার মনোমুগ্ধকর চিত্তজয়ী গানগুলো লিখেছেন তাঁদের মধ্যে পথিকৃৎ ছিলেন বাণীকুমার, হীরেন বসু, তুলসী লাহিড়ি, কাজী নজরুল ইসলাম, মনোজ বসু, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, হেমেন্দ্রকুমার রায়, প্রেমেন্দ্র মিত্র, বিমল ঘোষ, কৃষ্ণধন দে প্রমুখ। কিন্তু তখন গান রচনায় এগিয়ে ছিলেন কবি প্রেমেন্দ্র মিত্র। তিনি চলচ্চিত্রের সংলাপ এবং কাহিনীও লিখেছেন। তবে গীতরচনায় যে তিনজন অসামান্য জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন তাঁরা হলেন ত্রিরত্ন অজয় ভট্টাচার্য, শৈলেন রায় এবং প্রণব রায়। তাঁদের রচিত অনেক বিখ্যাত গান আজও প্রবীণদের শুধু নয় নবীনদেরও উদ্বেলিত করে। রিমেক গাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত আছে।

এই ত্রিরত্নর মধ্যে অজয় ভট্টাচার্য ছিলেন কুমিল্লা শহরের সন্তান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আগত অজয় ভট্টাচার্যের বাবা রাজকুমার ভট্টাচার্য কুমিল্লা জজ কোর্টের উকিল ছিলেন। তাঁর তিন ছেলের মধ্যে দুই ছেলেই ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য, নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতে। একজন অজয় ভট্টাচার্য, অন্যজন ইতিহাস-সৃষ্টিকারী সাহিত্য সাময়িকী ‘পূর্ব্বাশা’র সম্পাদক কবি ও সাহিত্যিক সঞ্জয় ভট্টাচার্য। দুই সহোদরই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র। দুজনেই প্রথমে ঈশ্বর পাঠশালার ছাত্র, পরে ভিক্টোরিয়া কলেজ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন অতিবাহিত করেন। পেশায় অধ্যাপক অজয় ভট্টাচার্য একাধারে ছিলেন কবি, গীতিকার, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেতা, অনুবাদক, কাহিনীকার, সংলাপরচয়িতা ও চলচ্চিত্রকার। চলচ্চিত্রের কথা বললে কুমিল্লা শহরের কৃতীসন্তান দাগু বর্ধন ও সুশীল মজুমদার অনুজ ননী মজুমদার কলকাতায় অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন চিত্রনির্মাতা হিসেবে।

কুমিল্লা টাউন হল মঞ্চে নিজের লেখা একাধিক নাটক মঞ্চস্থ করে অভিনেতা হিসেবে অজয় ভট্টাচার্য প্রভূত প্রশংসা কুড়িয়েছেন তরুণকালে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯২১ সালে যখন অজয় অষ্টম শ্রেণী থেকে নবম শ্রেণীতে উঠলেন তখন তাঁর স্কুল ঈশ্বর পাঠশালায় বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান উপলক্ষে প্রথম নাটক মঞ্চস্থ করা হয়। এই নাটকটির রচয়িতা ছিলেন ছাত্র অজয় ভট্টাচার্য। স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা দানবীর মহেশচন্দ্র ভট্টাচার্যর নির্দেশ ছিল নাটক হবে স্ত্রী চরিত্রবিহীন। কোনো ছেলে নাটকে মেয়ে সাজতে পারবে না। অজয় গিরিশচন্দ্র ঘোষের নাটক সিরাজ-উদ-দৌলা, নবীনচন্দ্র সেনের পলাশীর যুদ্ধ এবং অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় রচিত গবেষণামূলক গ্রন্থাদি থেকে সার সংগ্রহ করে স্ত্রী চরিত্রবিহীন বিদ্যালয়ে অভিনয়যোগ্য একটি নাটক রচনা করেন। তিনিই এই নাটকের প্রধান চরিত্র এবং নির্দেশক। তাঁর কনিষ্ঠ ভাই সঞ্জয় সেনাপতি মোহনলালের ভূমিকায় অভিনয় করে দর্শকবৃন্দকে বিমোহিত করেন। সঞ্জয় তখন মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র। তাঁর মুখে স্বদেশপ্রেম ও স্বাধীনতা রক্ষার আকুতিতে নিজেকে উৎসর্গ করার দৃঢ় প্রত্যয় উপস্থিত সকলকে অশ্রুসিক্ত করেছিল। এই মুহূর্তে অজয় রচিত নাটকটির নাম পাওয়া যাচ্ছে না তবে ‘সিরাজ-উদ-দৌলা’জাতীয় কিছু হবে। অনায়াসলব্ধ ছিল তাঁর জ্ঞান। ১৬ বছর বয়স থেকেই তিনি কবিতা লিখতেন, ছবি আঁকতেন, গান গাইতেন ও আড্ডায় বন্ধুবান্ধবদের শোনাতেন। বিশ্বসাহিত্য সম্পর্কে তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য সেই সময়কার শিক্ষক ও সহাপাঠীদের বিস্মিত করতো। তাঁর অনুজ সঞ্জয়ের সহপাঠী পরবর্তীকালে ডিপিআই তথা ডিরেক্টর অব পাবলিক ইন্সট্রাকশন, ওয়েস্ট বেঙ্গল সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা অমিয়ভূষণ দত্তগুপ্ত এক স্মৃতিচারণে বলেছিলেন, ‘অজয় ভট্টাচার্যের কাছে শক্ত বলে কোনোকিছু ছিল না।’

কুমিল্লার ত্রিরত্ন হিসেবে অসামান্য সাফল্য লাভ করেছেন গীতিকার অজয় ভট্টাচার্য এবং সুরকার হিসেবে শচীন দেববর্মণ ও হিমাংশু দত্ত। কৈশোর থেকেই তাঁদের ছিল গলায়-গলায় বন্ধুত্ব। সিনেমা তো আছেই, এর বাইরেও অনেক গান অজয় ভট্টাচার্য লিখেছেন আর সেগুলোতে সুর দিয়েছেন বন্ধু শচীন ও হিমাংশু। যেমন ভীষ্মদেব চট্টোপাধ্যায়ের গাওয়া অসাধারণ রাগপ্রধান গান ‘যদি মনে পড়ে’ ও ‘শেষের গানটি ছিল তোমারই লাগি’ অজয় ভট্টাচার্যের অমর কীর্তি। তাঁর রচিত গান যেসকল চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে সেগুলোর কয়েকটি হলো বিদ্রোহ, গৃহদাহ, দ্বীপান্তর, ব্যথার দান, মায়া, দিদি, মুক্তি, অভিজ্ঞান, দেশের মাটি, সাথী, অধিকার, জীবনমরণ, বড়দিদি, ডাক্তার, পরাজয়, শাপমুক্তি, রাজকুমারের নির্বাসন, মায়ের প্রাণ, আলোছায়া, রাজগী, এপার ওপার, রাজ নর্তকী, নিমাই সন্ন্যাস, মহাকবি কালিদাস, ছদ্মবেশী, দোটানা, প্রতিমা, পরভৃতিকা।

তাঁর হৃদয়ছোঁয়া সংবেদনশীল শব্দমালার জন্য রবীন্দ্র-নজরুল-কান্তকবিদের পরবর্তী পর্যায়ের শ্রেষ্ঠ গীতিকার হিসেবে অসামান্য সফলতা অর্জন করেছেন তিনি। অজয়ের আমলে প্রায় সকল জাঁদরেল সুরকার ও সঙ্গীতজ্ঞ যেমন রাইচাঁদ বড়াল, পঙ্কজ মল্লিক, কমল দাশগুপ্ত, তিমিরবরণ, অনুপম ঘটক, শচীনদেব, হিমাংশু তাঁর গানে সুর দিয়েছেন। অজয় ভট্টাচার্যের বিখ্যাত কয়েকটি গান হলো, দুঃখে যাদের জীবন গড়া, প্রেমের পূজায় এই তো লভিলি ফল, এই পেয়েছি অনলজ্বালা, একটি পয়সা দাওগো বাবু, এ গান তোমার শেষ করে দাও, তোমার কাছে চাইতে বঁধু, পাখি আজ কোন কথা কয়, বাংলার বধূ, আমি বনবুলবুল গাই গান, বিদেশিরে উদাসীরে, একদিন যবে গেয়েছিল পাখি, আজো ওঠে চাঁদ, আমার দেশে যাইও সুজন, যদি মনে পড়ে সেদিনের কথা, যার লাগি মোর, শুধু সুরে সুরে প্রভৃতি। তাঁর রচিত এবং শচীন দেববর্মণ ও হিমাংশু দত্ত সুরারোপিত গান শুনে কবি, গীতিকার ও সুরকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের পুত্র দিলীপকুমার রায়ের মতো প্রভূত প্রভাবশালী সঙ্গীতজ্ঞ গুণীজন পরিতৃপ্তি লাভ করে বলেছিলেন, ‘অজয়কুমারের এক-একটি সঙ্গীত এক-একটি কাব্য।’ তাঁর রচিত গীতসংকলন ‘শুকসারী’ থেকে কয়েকটি অধ্যাত্মসঙ্গীত দিলীপকুমার রায় সুদূর দক্ষিণভারতের পন্ডিচেরি শহরে অবস্থিত ঋষি শ্রীঅরবিন্দ ঘোষের আশ্রমে তাঁকে শোনালে পরে শ্রীঅরবিন্দ অত্যন্ত আনন্দিত হয়ে প্রশস্তিপত্র পর্যন্ত লিখেছিলেন অজয়কে: The songs are very beautiful. Here is evident everywhere in them a delicate psychic inspiration and poetic gift.

অজয় ভট্টাচার্য নিরলস লিখতেন। অনুজ সঞ্জয় ভট্টাচার্যের সাহিত্য কাগজ ‘পূর্ব্বাশা’তে প্রচুর লেখা প্রকাশ করেছেন। তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ রয়েছে যেমন 'রাতের রূপকথা', 'রুবাইয়াৎ-ই-ওমর খৈয়াম', 'তমসা, ঈগল ও অন্যান্য কবিতা', 'সৈনিক ও অন্যান্য কবিতা' উল্লেখযোগ্য। একটিমাত্র উপন্যাস ‘যেথা নাই প্রেম’ সাড়া জাগিয়েছিল। বিখ্যাত ইংরেজ সাহিত্যিক এরিখ মারিয়া রেমার্কের উপন্যাস ‘রোড ব্যাক’ বাংলায় অনুবাদ করে পূর্ব্বাশা কাগজেই প্রকাশ করেছেন। জনপ্রিয় গানের সংকলন ‘আজো ওঠে চাঁদ’ তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়। তিনি প্রায় দুই হাজার গান লিখেছেন বলে জানা যায়, তবে অধিকাংশই সিনেমার জন্য। ১৯৩৯ সালে ‘সুরের লিখন’ নামে তাঁর স্বরলিপি সংকলন প্রকাশিত হয়। সেই সুবাদে তিনি ছিলেন চিত্রগীতির ক্ষেত্রে পৃথিকৃৎ। ১৯৯১ সালে ত্রিপুরা রাজ্যসরকার ত্রিপুরা সঙ্গীত একাডেমী থেকে ‘অজয় ভট্টাচার্য’ নামে একটি স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ করে। অনুরূপ শচীন দেববর্মণের নামেও স্মারকগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল জন্মশতবর্ষে। তাঁর সম্পর্কে একাধিক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে এবং তথ্যাদিও পাওয়া যায়। তাঁকে নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে এবং হচ্ছেও কিন্তু অজয় ভট্টাচার্য, হিমাংশু দত্ত কিংবা সুবোধ পুরকায়স্থ সম্পর্কে আলোচনা খুব একটা দৃষ্টিগোচর হয় না।

অন্যদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আরেক কৃতী সন্তান সুরসাগর হিমাংশু দত্ত যাঁকে কলকাতার ‘সারস্বত মহামণ্ডল’ ১৯৩০ সালে ‘সুরসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করে। খুবই বিরল এবং মর্যাদাসম্পন্ন একটি উপাধি। এই উদ্যোগের পেছনে ছিলেন কলকাতার শোভাবাজারের রাজা গোপালকৃষ্ণ দেব। তিনি ছিলেন এই সংস্থার সভাপতি। তখন হিমাংশুর বয়স মাত্র বাইশ বছর। প্রথম জীবনে কলকাতায় পরিচয় ঘটে বিশ্বভারতীর অধ্যাপক পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেনের সঙ্গে। তখন সেন মহাশয় বিখ্যাত বিচিত্রা পত্রিকায় লিখছেন মীরার ভজন নিয়ে প্রবন্ধ ‘মীরার সঙ্গীত জীবন’ আর সেইসব ভজনের স্বরলিপি করছেন হিমাংশু। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও একটি গান ‘সকরুণ বেণু বাজায়ে’র স্বরলিপি করে খ্যাতিমান হন। ঢাকায় পনের বছরের হিমাংশুর কন্ঠে গান শুনে রবীন্দ্রনাথ বিমোহিত হয়ে পড়েছিলেন। পরবর্তীকালে বিচিত্রা পত্রিকায় হিমাংশুর সঙ্গীতবিষয়ক লেখা পাঠ করে রবীন্দ্রনাথ আবারও চমকে ওঠেন এবং কর্মসচিব কবি অমিয় চক্রবর্তীকে দিয়ে তাঁকে আহবান করে এনে কবিও তাঁর সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যুগলবন্দি হন। এমন ঘটনা খুব একটা বেশি ঘটেনি সেই সময়। তাঁর কাব্যসঙ্গীতচর্চা রবীন্দ্রনাথের প্রভাবমুক্ত স্বজাত্যে ভাস্বর ছিল। যেটা তখন ভাবনারও অতীত! ভারতীয় রাগসঙ্গীতের প্রভাব ব্যাপকভাবেই হিমাংশুর ওপর পড়েছিল বলে অনেকেই মনে করেন। রাগসঙ্গীতনির্ভর রোমান্টিসিজম তাঁর সুরে অনায়াসেই কাজ করেছে। কতখানি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল তাঁর সুর সেইসময়কার প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী সুপ্রভা সরকার এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ, সর্বশ্রেষ্ঠ বললেও অত্যুক্তি হবে না, সেই সুরস্রষ্টা, সেই মহাগুণী পুরুষটির নাম হিমাংশু দত্ত সুরসাগর।’

কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে ছিল তাঁর গভীর সখ্য। মনে হয় নজরুল কুমিল্লা থাকতেই তাঁদের মধ্যে জানাজানি ছিল, তিনি হিমাংশু ও সুবোধকে কলকাতায় আহ্বান করেছিলেন। নজরুলের লিখিত গানেও সুর করেছেন হিমাংশু। কবি অধ্যাপক বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গেও তাঁর ছিল প্রগাঢ় বন্ধুত্ব। বুদ্ধদেব এক স্মৃতিচারণে লিখেছেন, ‘সারাদিনের পাট চুকিয়ে কখনো একটু বেশি রাত্রে আসেন তিনি, খুব উৎফুল্ল, কেননা সেদিনই একটি নতুন রচনা সাঙ্গ করেছেন, রাণুকে (স্ত্রী প্রতিভা বসু) শেখান সেই গান।’

কুমিল্লা শহরের ঝাউতলার অধিবাসী সেই তুখোড় আড্ডাবাজ শচীন, অজয়, সঞ্জয়ের সুহৃদ হিমাংশু দত্ত যৌবনে কলকাতায় গীতিকার শৈলেন রায়, প্রণব রায় ও সুবোধ পুরকায়স্থর অনেক গানে সুর দিয়ে সুখ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁর সুরে বিখ্যাত সব শিল্পীরা কন্ঠ দিয়ে স্মরণীয় হয়ে আছেন যেমন, হেমন্ত, সন্ধ্যা, মানবেন্দ্র, শ্যামল, প্রতিমা, শিপ্রা বসু, আরতি, কৃষ্ণা চট্টোপাধ্যায়, অনুপ ঘোষাল, নির্মলা মিশ্র প্রমুখ। তিনি একাধারে ছিলেন কন্ঠশিল্পী, সঙ্গীত পরিচালক ও সুরকার।

শচীনদেবের সহপাঠী হিমাংশু কৈশোরে ছিলেন কুমিল্লা জিলা স্কুলের ছাত্র। পরে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। এই সময় থেকে তাঁর সঙ্গীতজগতে কন্ঠশিল্পী হিসেবে জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তাঁর সুরারোপিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘দক্ষযজ্ঞ’ ১৯৩৪ সালে নির্মিত হয়েছিল। এরপর ১৯৩৭ সালে ‘প্রভাস মিলন’। তবে এ দুটিতে তিনি যৌথভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন। এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করেন ‘অভিনয়’ ছবিতেই প্রথম। ১৯৩৯ সালে সঙ্গীত পরিচালনা করেন ‘পরশমণি’ ছবিতে। এটাতে শৈলেন রায় রচিত ‘রাতের ময়ূর ছড়াল’ একটি অবিস্মরণীয় চিত্রগীতি। এভাবে তিনি রুক্ষ্মিণী, নন্দিনী, পথ ভুলে, স্বামী স্ত্রী, অবতার, শ্রীরাধা, সমাজ, গৃহলক্ষ্মী, অভিসার, জননী, পাপের পথে, সন্ধ্যা, জীবনসঙ্গিনী প্রভৃতি ছবির সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। সব ছবিতেই সুররচনার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত রেখেছেন। তাঁর জনপ্রিয় কালজয়ী গানগুলোর মধ্যে তোমারই পথপানে চাহি আমার এ পাখি গান গায়-শৈলেন রায় রচিত এবং শ্যামল মিত্র গীত- আজও মানুষের মুখেমুখে ফেরে। অন্যগুলোর মধ্যে চাঁদ কহে চামেলীগো, বিরহিণী চিরবিরহিণী, নিশীথে চলে হিমেল বায়, বর্ষার মেঘ নামে, তব স্মরণখানি, আলোছায়া দোলা, আবেশ আমার যায় উড়ে কোন ফাল্গুনে, খুঁজে দেখা পাইনে যাহার, ডাক দিয়ে যায় কেগো আমায় বাজিয়ে বাঁশি, তুমি তো বঁধু জানো, নতুন ফাগুন যাবে, বর্ষার মেঘ ডাকে ঝড় বরিষণে, মম মন্দিরে, প্রেমের না হবে ক্ষয়, আকাশের চাঁদ মাটির ফুলেতে, আশা পাখি মোর, মনরে তারে বাঁধবি, নবঘন সুন্দর শ্যাম, আজ ফাগুনের প্রথম দিনে উল্লেখযোগ্য। প্রখ্যাত গীতিকার ও গায়ক সুমন চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি গান ‘তোমাকে চাই’-এর একটি জায়গায় গেয়েছেন ‘.....ভুলে যাওয়া হিমাংশু দত্তের সুরে’। এই হিমাংশুই কুমিল্লার গৌরব সুরসাগর হিমাংশু দত্ত। সুমন তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেছেন সঙ্গত কারণেই। তরুণ প্রজন্ম তাঁকে জানে না, যেমন জানে না অজয় অথবা আরেক সৃষ্টিপুরুষ জমিদারপুত্র গীতিকার সুবোধ পুরকায়স্থকেও (১৯০৭-১৯৮৪)।

সুবোধ কুমিল্লা শহরেরই আরেক কৃতী সন্তান। একদল সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাট্যপাগল তরুণ আড্ডা দিতেন যৌবনে শহরের কান্দিরপাড়সংলগ্ন নজরুল এভিনিউস্থ ‘লক্ষ্মী কেবিন’ চায়ের দোকানে, যার কর্ণধার ছিলেন দীনেশ ও গণেশ দুই ভাই। আড্ডারুরা ছিলেন শচীন দেব, অজয়, সঞ্জয়, সুবীর সেন, সুধীর চক্রবর্তী, অজিতকুমার গুহ, নারায়ণ চৌধুরী, অমিয় চৌধুরী, সত্যপ্রসন্ন দত্ত, সুশীল মজুমদার, ননী মজুমদার, ত্রিদিব দত্ত প্রমুখ। সুবোধ পুরকায়স্থ তাঁদের মধ্যে ছিলেন অন্যতম। তাঁরাই আড্ডা দিতে গিয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ‘পূর্ব্বাশা’ কাগজ প্রকাশের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। কুমিল্লার বিখ্যাত ‘জগৎ সুহৃদ প্রেসে’ সেটা ছাপা হতো, মাঝে মাঝে আরেকটি গৌরবময় প্রতিষ্ঠান ‘সিংহ প্রেসে’ও মুদ্রিত হতো। সেই মেধাবী কবি সুবোধ পুরকায়স্থ ১৯৪৩ সালে যখন বন্ধু অজয় ভট্টাচার্যের অকাল মৃত্যু ঘটে তিনি হিমাংশুর সঙ্গে জুটি বেঁধে অনেক গান সৃজন করেন। তিনিও কুমিল্লা জিলা স্কুলে হিমাংশুর সহপাঠী ছিলেন। হিমাংশুও অজয়ের মতো অকালে মৃত্যুবরণ করেন মাত্র ৩৬ বছর বয়সে। ব্যর্থপ্রেম ছাড়াও নানারকম মানসিক ব্যাধিতে তিনি ছিলেন অসুখী একজন মানুষ। সুবোধের পিতাও ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে এই শহরে এসেছিলেন বলে জানা যায়।

১৯৪৪ সালে সুবোধ প্রথম গান লিখেন ‘সন্ধি’ ছায়াছবির জন্য যার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন হিমাংশু দত্ত বলে প্রতীয়মান হয়। সুরকার অনিল বিশ্বাসের সুরে ‘শান্তি’ এবং কমল দাশগুপ্তের সুরে ‘চন্দ্রশেখর’ ছায়াছবির জন্য লিখিত তাঁর গীতরচনা ব্যাপক সাফল্য এনে দিয়েছে। তবে সিনেমার গানের তুলনায় সুবোধ পুরকায়স্থ আধুনিক বাংলা গানের জন্য বেশি খ্যাত। তাঁর লিখিত বিখ্যাত গানগুলোর মধ্যে, মেনেছি গো হার মেনেছি- কমল দাশগুপ্ত সুরারোপিত এবং জগন্ময় মিত্রর কন্ঠে গীত- আজও আপ্লুত করে শ্রোতার মনকে; অন্যান্য গানগুলো হচ্ছে, চাঁদ কহে চামেলীগো, হে নিরুপমা, নবজীবনের প্রথম অরুণ প্রাতে, আজি মিলন নিশি ভোরে, জানি জানি গো, তুমি যারে চাও, হৃদয় কাহারে যেন, আজ ফাগুনের প্রথম দিনে প্রভৃতি।

বাংলা গানের জগতে সুবোধ পুরকায়স্থর একটি বিশেষ অবদান হচ্ছে গানের রেকর্ডে গীতিকারদের নাম মুদ্রণের দাবি আদায়ের কাজ সম্পাদন। তিনি একক উদ্যোগে এটা সফল করেছিলেন। যে কারণে আজকে বিস্মৃত অনেক গীতিকারদের নামও আমরা খুঁজে পাচ্ছি পুরনো রেকর্ডে। তা না হলে হয়তো সেসব নাম কালের গর্ভে হারিয়েই যেত। বাংলা সিনেমার গানের তিন দশকে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন অজয় ভট্টাচার্য-শৈলেন রায়-প্রণব রায় ত্রয়ী। যেমনটি পরবর্তীকালের পঞ্চাশ-ষাট দশকের ত্রয়ী জনপ্রিয় গীতিকার ছিলেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, শ্যামল গুপ্ত ও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুদ্ধদেব বসু

বুদ্ধদেব বসু


বুদ্ধদেব বসু (জন্মঃ নভেম্বর ৩০, ১৯০৮ মৃত্যুঃ মার্চ ১৮, ১৯৭৪)
বিংশ শতাব্দীর বিশ ও ত্রিশের দশকের নতুন কাব্যরীতির সূচনাকারী কবি হিসেবে তিনি সমাদৃতঅল্প বয়স থেকেই কবিতা রচনা করেছেন, ছেলে জুটিয়ে নাটকের দল তৈরী করেছেনপ্রগতি ও কল্লোল নামে দুটি পত্রিকায় লেখার অভিজ্ঞতা সম্বল করে যে কয়েকজন তরুণ বাঙালী লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জীবদ্দশাতেই রবীন্দ্রনাথের প্রভাবের বাইরে সরে দাঁড়াবার দুঃসাহস করেছিলেন তিনি তাঁদের অন্যতমইংরেজি ভাষায় কবিতা, গল্প, প্রবন্ধাদি রচনা করে তিনি ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় প্রশংসা অর্জন করেছিলেন
ব্যক্তিগত জীবন :  
বুদ্ধদেব বসুর জন্ম হয় কুমিল্লায় তাঁর পিতা ভূদেব বসু পেশায় ঢাকা বারের উকিল ছিলেনতাঁর মাতার নাম বিনয়কুমারীবুদ্ধদেব বসুর পিতামহ চিন্তাহরণ সিংহ ছিলেন পুলিশ অফিসার তাঁর পৈতৃক আদি নিবাস ছিল বিক্রমপুরের মালখানগর গ্রামেজন্মের চব্বিশ ঘন্টা পরেই তাঁর মাতা বিনয় কুমারী ১৬ বছর বয়সে ধনুষ্টঙ্কার রোগে মৃত্যু ঘটেএতে শোকাভিভূত হয়ে তাঁর পিতা সন্ন্যাসব্রত গ্রহণ করে গৃহত্যাগ করেন মাতামহ-মাতামহীর কাছে প্রতিপালিত হন বুদ্ধদেবপুলিশ অফিসার বা দারোগা চিন্তাহরণ সিংহ ছিলেন তাঁর পিতামহবুদ্ধদেবের শৈশব, কৈশোর ও যৌবনের প্রথমভাগ কেটেছে কুমিল্লা, নোয়াখালী আর ঢাকায়
১৯২১ সালে ১৩ বছর বয়সে তিনি ঢাকায় আসেন এবং প্রায় দশ বৎসর ঢাকায় শিক্ষালাভ করেনবুদ্ধদেব বসু ১৯২৩ সালে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে নবম শ্রেণীতে ভর্তি হন১৯২৫ সালে ঐ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে প্রথম বিভাগে পঞ্চম স্থান অধিকার করেন১৯২৭ সালে ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) থেকে প্রথম বিভাগে দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে আই. এ. পাস করেনএরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে থেকে ইংরেজিতে ১৯৩০-এ প্রথম শ্রেণীতে বি. এ. অনার্স এবং ১৯৩১-এ প্রথম শ্রেণীতে এম.এ. ডিগ্রি লাভ করেনতিনি ছিলেন মেধাবী এক ছাত্রবি. এ. অনার্স পরীক্ষায় তিনি যে নম্বর লাভ করেন তা একটি রেকর্ড; এবং অদ্যাবধি (২০০৯) এ রেকর্ড অক্ষূণ্ণ আছে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শেষে ১৯৩১ খৃষ্টাব্দে তিনি ঢাকা পরিত্যাগ করতঃ কলকাতায় অভিভাসন গ্রহণ করে সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন ১৯৩৪ সালে খ্যাতিমান লেখিকা প্রতিভা বসুর (বিবাহ-পূর্বঃ প্রতিভা সোম) সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হনবুদ্ধদেব বসু ১৯৭৪ সালের ১৮ই মার্চ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন
কর্ম জীবন :  
অধ্যাপনার মাধ্যমেই তাঁর কর্মময় জীবন শুরুজীবনের শেষাবধি তিনি নানা কাজে-কর্মে ব্যাপৃত রেখেছেনশিক্ষকতাই ছিল জীবিকা অর্জনে তার মূল পেশাকর্মময় জীবনের শুরুতে স্থানীয় কলেজের লেকচারের পদের জন্য আবেদন করে দুবার প্রত্যাখ্যাত হলেও ইংরেজি সাহিত্যে অগাধ পাণ্ডিত্যের জন্য পরিণত বয়সে তিনি আমেরিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভারতীয় ভাষা ও সাহিত্য সম্পর্কে সারগর্ভ বক্তৃতা দিয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেনবাঙলা ভাষার তুলনামূলক সাহিত্য সমালোচনার ক্ষীণস্রোতকে তিনি বিস্তৃত ও বেগবান করেন১৯৩৪ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত কলকাতা রিপন কলেজে ইংরেজি সাহিত্যে অধ্যাপনা করেন১৯৪৫ থেকে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত স্টেটসম্যান পত্রিকায় সাংবাদিকতা করেন১৯৫২ সালে দিল্লী ও মহিশূরে ইউনেস্কোর প্রকল্প উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পিটসবার্গের পেনসিলভেনিয়া কলেজ ফর উইমেনে শিক্ষকতা করেন তিনি১৯৫৬ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বুদ্ধদেব বসু তুলনামূলক ভাষা ও সাহিত্যের অধ্যাপক নিযুক্ত হন
এছাড়াও, তিনি উচ্চ মানের সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছেনঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে বুদ্ধদেব বসু প্রভুগুহ ঠাকুরতা, অজিত দত্ত প্রমূখকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছিলেনএ সময় ঢাকার পুরানা পল্টন থেকে তাঁর ও অজিত দত্তের যৌথ সম্পাদনায় ১৯২৭ ১৯২৯ পর্যন্ত সচিত্র মাসিকপ্রগতি’ (১৯২৭) মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা করেন এবং কল্লোল’ (১৯২৩) গোষ্ঠীর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক স্থাপিত হয়কলকাতায় বসবাসকালে তিনি প্রেমেন্দ্র মিত্রের সহযোগিতায় ১৯৩৫ সালে ত্রৈমাসিক কবিতা (আশ্বিন ১৩৪৪) পত্রিকা সম্পাদনা করে প্রকাশ করেনপঁচিশ বছরেরও অধিককাল তিনি পত্রিকাটির ১০৪টি সংখ্যা সম্পাদনা করে আধুনিক কাব্যআন্দোলনে নেতৃত্ব দেনতৃতীয় বর্ষ ১ম সংখ্যা (আশ্বিন ১৩৪৪) থেকে বুদ্ধদেব ও সমর সেন এবং ষষ্ঠ বর্ষ তৃতীয় সংখ্যা (চৈত্র ১৩৪৭) থেকে বুদ্ধদেব বসু একাই এর সম্পাদক ছিলেনতাঁরই অনুপ্রেরণায়, সদিচ্ছায়, অনুশাসনে এবং নিয়ন্ত্রণে আধুনিক বাংলা কবিতা তার যথার্থ আধুনিক রূপ লাভ করেএটি কবি বুদ্ধদেব বসুর জীবনের একটি উল্লেখযোগ্য কীর্তিবাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ক্রমবিকাশে কবিতা পত্রিকার ভূমিকা দূরসঞ্চারীআধুনিক বাংলা কবিতার সমৃদ্ধি, প্রসার ও তা জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে কবিতার তুলনারহিত
১৯৩৮ সালে হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ত্রৈমাসিক চতুরঙ্গ সম্পাদনা করেন১৯৪২ সালে ফ্যাসীবাদবিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের আন্দোলনে যোগদান করেন পঞ্চাশের দশক থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতির একজন সমর্থক হিসেবে পরিচিত ছিলেনতিনি আধুনিক বাংলা সাহিত্যের একজন শ্রেষ্ঠ লেখক ছিলেনবুদ্ধদেব বসুর গদ্য ও পদ্যের রচনাশৈলী স্বতন্ত্র ও মনোজ্ঞরবীন্দ্র-উত্তর আধুনিক কাব্য ধারার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্যগদ্যশিল্পী হিসেবে সমধিক সৃজনশীল প্রতিভার পরিচয় প্রদান করেনপরিমার্জিত সঙ্গীতময়তা ও পরিশীলিত স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁর গদ্যের বৈশিষ্ট্যসৃষ্টিশীল সাহিত্য রচনার পাশাপাশি সমালোচনামূলক সাহিত্য রচনায়ও মৌলিক প্রতিভার পরিচয় প্রদান করেনবাংলা গদ্যরীতিতে ইংরেজি বাক্য গঠনের ভঙ্গী গ্রথিত করে বাংলা ভাষাকে অধিকতর সাবলীলতা দান করেন তিনি
বুদ্ধদেব বসু সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে জগদীশ ভট্টাচার্য বলেছেন,
আধুনিক বাংলা-সাহিত্যের যে অধ্যায়কে বলা হয় কল্লোল যুগসেই অধ্যায়ের তরুণতম প্রতিনিধি ছিলেন বুদ্ধদেব বসু১৩৩০ বঙ্গাব্দে যখন কল্লোলপ্রকাশিত হয় তখন বুদ্ধদেবের বয়স মাত্র পনেরোকলকাতায় কল্লোল (১৩৩০) এবং কালিকলমের (১৩১৩) মতো ঢাকায় প্রগতিছিল সে যুগের আধুনিকতার মুখ্য বার্তাবহগ্রন্থকার হিসেবে বুদ্ধদেবের জীবনে ১৯৩০ সালটি বিশেষ উল্লেখযোগ্যএই বৎসরেই তাঁর বন্দীর বন্দনা (কাব্য), সাড়া (উপন্যাস), অভিনয় নয় (ছোট গল্প-সঙ্কলন) প্রকাশিত হয়তখন তিনি সবেমাত্র একুশ বৎসর অতিক্রম করেছেন
সাহিত্যে অবদান :
ছাত্রজীবনে ঢাকায় তিনি যে এক্সপেরিমেন্ট শুরু করেন প্রৌঢ় বয়সেও সেই এক্সপেরিমেন্টের শক্তি তাঁর মধ্যে প্রত্যক্ষ করা যায়তাঁর প্রথম যৌবনের সাড়া এবং প্রাক-প্রৌঢ় বয়সের তিথিডোর উপন্যাস দুটি দুই ধরনের এক্সপেরিমেন্টতাঁর চল্লিশোর্ধ বয়সের রচনাগুলোর মধ্যে গ্রীক, ল্যাটিন, সংস্কৃত নানা চিরায়ত সাহিত্যের উপমার প্রাচুর্য্য দেখা যায়অতি আধুনিক উপন্যাসের গীতিকাব্যধর্মী উপন্যাস রচনা করেছিলেন বুদ্ধদেব বসুরচনার অজস্রতা এবং অভিনব লিখনভঙ্গীর দিক দিয়ে তিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেনতাঁর উপন্যাসে যে ঘাত-প্রতিঘাত ও মানবিক প্রতিক্রিয়া বর্ণনা করেছেন, তাতে মনঃস্তত্ত্বের বিশ্লেষণের পরিবর্তে কাব্যোচ্ছাসের প্রাধান্য বিদ্যমানঅকর্মণ্য, রডোড্রেনড্রন গুচ্ছ, যেদিন ফুটল কমল প্রভৃতি উপন্যাসে বুদ্ধদেব বসু কাব্যপ্রবণতার পরিচয় দিয়েছেন তিথিডোর, নির্জন স্বাক্ষর, শেষ পাণ্ডুলিপি ইত্যাদি উপন্যাস নতুন জীবন-সমীক্ষা-রীতির পরিচয়বাহী
বুদ্ধদেব বসুর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ পৃথিবীর প্রতি (১৯৩৩) বন্দীর বন্দনার পরিপূরক গ্রন্থউভয় গ্রন্থেই শরীরী প্রত্যয়ে প্রেমের অভিব্যঞ্জনা প্রকাশ পেয়েছেকিছুটা স্বাদের ব্যতিক্রম এসেছে – ‘কঙ্কাবতী’ (১৯৩৭) কাব্যগ্রন্থেপদ ও বাক্যাংশের পুনরাবৃত্তির সাহায্যে একটি ধ্বনি আবর্ত নির্মাণ করে বুদ্ধদেব বসু যৌবনের আনন্দগানকে স্বাগত জানিয়েছেন
বুদ্ধদেব বসু ছিলেন আধুনিক কবিকুলের অন্যতম পৃষ্ঠপোষকসুকুমার সেনের ভাষায় -
তাঁর লক্ষ্য ছিল আধুনিক কবিতার স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করা এবং আধুনিককবিতা লেখকদের পক্ষ সমর্থন করা
সৃজনশীল সাহিত্যের সঙ্গে সমালোচনামূলক সাহিত্যে তাঁর সাফল্য সমপর্যায়েরতিনি বাংলা গদ্যরীতিতে ইংরেজি বাক্যগঠনের ভঙ্গী সুপ্রসিদ্ধ করেছেনপরিমার্জিত সঙ্গীতমগ্নতা ও পরিশীলিত স্বতঃস্ফূর্ততা বুদ্ধদেব বসু গদ্যের বৈশিষ্ট্যকবিতা, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, সমালোচনা, নাটক, কাব্যনাটক, অনুবাদ, সম্পাদনা, স্মৃতিকথা, ভ্রমণ, শিশুসাহিত্য ও অন্যান্য বিষয়ে বসুর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ১৫৬টি
বাংলা সাহিত্যে আধুনিকতার পত্তনে যে কয়েকজনের নাম সর্বাগ্রে স্মরণীয় বুদ্ধদেব বসু তার মধ্যে অন্যতমতাকে কল্লোল যুগ-এর অন্যতম প্রধান কাণ্ডারী হিসেবে গণ্য করা হয়বাংলা কবিতায় আধুনিক চিন্তা-চেতনা এবং কাঠামো প্রবর্তনে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেনইংরেজি সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে পশ্চিমা সাহিত্যের সঙ্গে তার সম্যক পরিচয় ছিলফলে ইউরোপীয় এবং মার্কিন সাহিত্যের কলা-কৌশল বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তনে তিনি বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছিলেনকলকাতায় তার বাড়ির নাম রেখেছিলেন কবিতাভবন যা হয়ে উঠেছিল আধুনিক বাংলা সাহিত্যের তীর্থস্থান১৯৩০-এর দশক থেকে শুরু করে পরবর্তী কয়েকটি দশক সাহিত্য পরিমণ্ডলে তার প্রভাব ছিল অবিসংবাদিত সাহিত্যের প্রায় সকল শাখায় তিনি কাজ করেছেন
জীবনের শেষের দিকে তিনি নাট্যকাব্য রচনায় মনোনিবেশ করেছিলেনতপস্বী ও তরঙ্গিনী, কলকাতার ইলেকট্রা ও সত্যসন্ধ, কালসন্ধ্যা, পুনর্মিলন, অনামী অঙ্গনা ও প্রথম পার্থ প্রভৃতি নাট্যকাব্য বাংলা সাহিত্যে একটি নতুন শিল্পরূপে জন্ম দিয়েছেজগদীশ ভট্টাচার্য যথার্থই বলেছেন,
বস্তুত শুধু নিজে অজস্র রূপ ও রীতির কবিতা লিখেই নয়, সহযাত্রী এবং উত্তরসূরি আধুনিক কবি সমাজকে কবি মর্যাদায় সমুন্নীত করে কবিতা সম্পাদক বুদ্ধদেব বসু একালের বাংলা কাব্যের ইতিহাসে অমর হয়ে রইলেন
উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ :
কবিতাঃ মর্মবাণী (১৯২৫), বন্দীর বন্দনা (১৯৩০), পৃথিবীর পথে (১৯৩৩), কঙ্কাবতী (১৯৩৭), দময়ন্তী (১৯৪৩), দ্রৌপদীর শাড়ি (১৯৪৮), শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৫৩), শীতের প্রার্থনা: বসন্তের উত্তর (১৯৫৫), যে-আঁধার আলোর অধিক (১৯৫৮), দময়ন্তী: দ্রৌপদীর শাড়ি ও অন্যান্য কবিতা (১৯৬৩), মরচেপড়া পেরেকের গান (১৯৬৬), একদিন: চিরদিন (১৯৭১), স্বাগত বিদায় (১৯৭১)
উপন্যাসঃ সাড়া (১৯৩০), সানন্দা (১৯৩৩), লাল মেঘ (১৯৩৪), পরিক্রমা (১৯৩৮), কালো হাওয়া (১৯৪২), তিথিডোর (১৯৪৯), নির্জন স্বাক্ষর (১৯৫১), মৌলিনাথ (১৯৫২), নীলাঞ্জনের খাতা (১৯৬০), পাতাল থেকে আলাপ (১৯৬৭), রাত ভর বৃষ্টি (১৯৬৭), গোলাপ কেন কালো (১৯৬৮), বিপন্ন বিস্ময় (১৯৬৯), রুক্‌মি (১৯৭২)
গল্পঃ অভিনয়, অভিনয় নয় (১৯৩০), রেখাচিত্র (১৯৩১), হাওয়া বদল (১৯৪৩), শ্রেষ্ঠ গল্প (১৩৫৯), একটি জীবন ও কয়েকটি মৃত্যু (১৯৬০), হৃদয়ের জাগরণ (১৩৬৮), ভালো আমার ভেলা (১৯৬৩), প্রেমপত্র (১৯৭২)
প্রবন্ধঃ হঠাৎ-আলোর ঝলকানি (১৯৩৫), কালের পুতুল (১৯৪৬), সাহিত্যচর্চা (১৩৬১), রবীন্দ্রনাথ: কথাসাহিত্য (১৯৫৫), স্বদেশ ও সংস্কৃতি (১৯৫৭), সঙ্গ নিঃসঙ্গতা ও রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৩), প্রবন্ধ-সংকলন (১৯৬৬), কবি রবীন্দ্রনাথ (১৯৬৬)
নাটকঃ মায়া-মালঞ্চ (১৯৪৪), তপস্বী ও তরঙ্গিণী (১৯৬৬), কলকাতার ইলেক্ট্রা ও সত্যসন্ধ (১৯৬৮)
অনুবাদঃ কালিদাসের মেঘদূত (১৯৫৭), বোদলেয়ার: তাঁর কবিতা (১৯৭০), হেল্ডালিনের কবিতা (১৯৬৭), রাইনের মারিয়া রিলকের কবিতা (১৯৭০)
ভ্রমণ কাহিনীঃ সব-পেয়েছির দেশে (১৯৪১), জাপানি জার্নাল (১৯৬২), দেশান্তর (১৯৬৬),
স্মৃতিকথাঃ আমার ছেলেবেলা (১৯৭৩), আমার যৌবন (১৯৭৬)
সম্পাদনাঃ আধুনিক বাংলা কবিতা (১৯৬৩)
সম্মাননা :
১৯৭০ সালে পদ্মভূষণ উপাধি লাভ করেন
১৯৬৭ সালে তপস্বী ও তরঙ্গিণী কাব্যনাট্যের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার লাভ করেন
১৯৭৪ সালে স্বাগত বিদায় গ্রন্থের জন্য রবীন্দ্র-পুরস্কার (মরণোত্তর) লাভ করেন