Showing posts with label লাকসাম. Show all posts
Showing posts with label লাকসাম. Show all posts

16 June 2017

বেড়িয়ে আসুন লাকসামের দর্শনীয় স্থান ও জমিদারি রাজমহল

বেড়িয়ে আসুন লাকসামের দর্শনীয় স্থান ও জমিদারি রাজমহল


শতবর্ষের ইতিহাস, ঐতিহ্য, রাজনীতি, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে লাকসাম পরিচিত। অতীতের হোমনাবাদ ও মেহেরকুল পরগনার স্মৃতিবিজড়িত অমর কাহিনী ও মহাপুরুষ আধ্যাত্মিক পীর-আউলিয়ার আগমন ও কিছু স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছে লাকসাম। লাকসামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত দেশের অন্যতম ডাকাতিয়া নদী। এশিয়ার মহীয়সী নারী ও নারী শিক্ষার অগ্রদূত ব্রিটেনের রানী এলিজাবেথ কর্তৃক নবাব উপাধিতে ভূষিত নবাব ফয়জুন্নেছার জন্মস্থান ও জমিদার বাড়ি। অতীতে গৌরব করার মতো যা ছিল বর্তমানে লাকসামে তাই আছে।

লাকসাম যেভাবে নামকরণঃ
অতীতের হোমনাবাদ এলাকার একটি অংশ লক্ষ্যস্যাম। স্যাম মানে বন্ধু। এ এলাকায় এক সময় ছিল লক্ষবন্ধুর বসবাস। লাটসাব ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের জমিদারি ছিল বেশি। অতীতের লক্ষ্যস্যাম থেকেই লাকসাম নামকরণের উত্পত্তি হয় এবং বর্তমানে লাকসাম উপজেলা।

লাকসাম এসে যা দেখবেনঃ
কত লাকসাম কত বাত্তি নামে খ্যাত লাকসাম এসে দেখবেন, দেখার সার্থক হবে প্রথমেই শতবর্ষের নির্মিত ঐতিহ্যবাহী লাকসাম রেলওয়ে জংশন। এ রেলওয়ে জংশনে প্রতিদিন শত শত লোক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, চাঁদপুর ও নোয়াখালী ট্রেনে করে উঠানামা করছে। লাকসাম রেলওয়ে জংশনে বিভিন্নমুখী ট্রেনগুলো এসে থেমেই মানুষের পদভারে মুখরিত হয়। সব দৃশ্য রেলওয়ে জংশনের ওভারব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখার মতো। পৌর শহরের পশ্চিমগাঁওতে ঐতিহ্যবাহী দেশের অন্যতম ডাকাতিয়া নদীর তীর ঘেঁষে এশিয়ার মহীয়সী নারী বাংলাদেশের খ্যাতিমান মহিলা নওয়াব ফয়েজুন্নেছা জমিদার বাড়ি, খান বাহাদুর বাড়ি, বাগিছা বাড়ি, ১০ গম্বুজ মসজিদ, নওয়াব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ, নওয়াব ফয়জুন্নেছা ও বদরুন্নেছা যুক্ত উচ্চ বিদ্যালয়; এছাড়া আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ হজরত গাজীউল হক সাহেবের মাজার শরীফ। যে মাজারে প্রতিদিন লোকজন এসে ভক্তি-শ্রদ্ধা প্রদান করছে। এ মাজারে কেউ মিলাদ পড়ায়। আবার কেউ পাশেই সুরম্য প্রাচীন কালে নির্মিত মসজিদে নামাজ আদায় করে। অতীত দিনের স্মৃতি দৌলতগঞ্জ জগন্নাথ মন্দির, এক সময়ে অতুল হাই বর্তমানে লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়। লাকসামের শেষ প্রান্তে পশ্চিম চিতোষীতে নাটেশ্বরে বিরাট আকারের দীঘি ও প্রাচীন মসজিদ, লাকসামের বরইগাঁও আন্তর্জাতিক বৌদ্ধবিহার কমপ্লেক্সসহ লাকসাম পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, উহার পাশেই কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক লিমিটেড ভবন, যা এখন পরিত্যক্ত, প্রথম শ্রেণীর লাকসাম পৌরসভা ভবন, গণপাঠাগার, গণমিলনায়তন, স্বাধীনতা যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভ ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কার্যালয়, পূর্ব লাকসামে স্থাপিত আলতাফ অটোমেটিক রাইস মিল, নশরতপুরে ভাইয়া গ্রুপের অটোমেটিক রাইস মিল, থ্রি এ ও গোল্ড কিং সিগারেট ফ্যাক্টরি, মামুন বিড়ি, দিদার বিড়ি, রূপালী বিড়ি ফ্যাক্টরি, আজম খানের দেয়া লাকসাম স্টেডিয়াম, হিন্দু সমপ্রদায়ের পূজামণ্ডপের স্থান মুক্তকেশী কালীবাড়ী, ফতেপুরে আবুল খায়ের গ্রুপ নির্মিত আবুল বিড়ি ফ্যাক্টরি, রেলি ও সুপার কিং ফ্যাক্টরি, চট্টগ্রাম বিভাগীয় শ্রেষ্ঠ ভাইয়া গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান সোহাগ মত্স্য বীজ উত্পাদন ও প্রজনন খামার, গাজীমুড়া আলিয়া মাদ্রাসা প্রমুখ।

ঐতিহ্যবাহী ডাকাতিয়া নদীঃ
লাকসামের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে দেশের অন্যতম ডাকাতিয়া নদী। ডাকাতিয়া নদী ভারতের রঘুনন্দন পাহাড় থেকে উত্পত্তি হয়ে নিজ গতিতে চৌদ্দগ্রাম উপজেলার উত্তর দিয়ে লাকসামে প্রবেশ করেছে। ডাকাতিয়া নদীর দৈর্ঘ্য ৭৫ কিমি, প্রস্থ ২৫০ ফুট। বর্তমান গড় গভীরতা ৪০ ফুট।

নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর নবাববাড়িঃ
এশিয়ার মহীয়সী নারী বাংলাদেশের গৌরব নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী। লাকসামের ডাকাতিয়া নদীর উত্তর তীরে খান বাহাদুর বাড়িতে নবাব ফয়জুন্নেছা জন্মগ্রহণ করেন। ফয়জুন্নেছার জন্ম ১৮৩৪ সালে। রূপজালাল নামক গ্রন্থ বাংলাভাষায় লিখিত মহিলাদের মধ্যে সর্বাগ্রে প্রকাশিত বই। মহিলা লেখিকাদের পথপ্রদর্শক ছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছা। সাহিত্যের ইতিহাসে এটি এক বিরল দৃষ্টান্ত। নবাব ফয়জুন্নেছার রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ তার স্বামী গাজী চৌধুরীর নামে উত্সর্গ করেছেন। ফয়জুন্নেছার পিতার নাম সৈয়দ আহম্মদ আলী চৌধুরী। তার মাতার নাম আরফান্নেছা চৌধুরানী। ভাইবোনদের মধ্যে ফয়জুন্নেছাই জমিদারি পরিচালনার প্রশিক্ষণ পান। হোমনাবাদ পরগনার বিরাট জমিদারি তিনি পরিচালনা করেন। ফয়জুন্নেছার গৃহশিক্ষক ছিলেন তাজ উদ্দিন। ১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ১৩১০ বাংলা ২০ আশ্বিন নবাব ফয়জুন্নেছা ইন্তেকাল করেন। তার জমিদারির ১১টি কাচারির মধ্যে প্রত্যেকটির পাশে বিশুদ্ধ পানির জন্য পুকুর কাটান এবং মক্তব ও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তিনি ইসলামী কায়দায় বোরকা পরে পালকিতে করে প্রত্যেকের সুখ-দুঃখ দেখতে গ্রামে গ্রামে যান। বালিকা বিদ্যালয় কালের সাক্ষ্যবহন করেছে।
নবাব বাড়ির বালিকা বিদ্যালয়টি কালক্রমে লাকসাম পাইলট উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে রূপ নিয়েছে। লাকসামের নবাব ফয়জুন্নেছা একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র হিসেবে বাংলাদেশ তথা সমগ্র এশিয়া অতঃপর বিশ্বে তার নাম ছড়িয়ে রয়েছে। তার নাম গুণকীর্তন করে দেশের মানুষ ধন্য হচ্ছে।
সাহিত্যচর্চায় নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিভা দুনিয়ার মানুষ স্বীকার করেছে। এক তথ্যে জানা যায়, গাজি চৌধুরী প্রথমে বিয়ে করেন বেগম নজমুন্নেছাকে। সতীন যাতনায় অতিষ্ঠ হয়ে ফয়জুন্নেছা বাকশার গ্রামে অল্প কিছুদিন থেকে পরে লাকসামের পশ্চিমগাঁওতে স্থায়ী বসবাস করেন। শেষ বয়সে গাজী চৌধুরী দারুণ ব্যথা-বেদনায় কুমিল্লা শহরের মীর বাড়িতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের গৌরব নবাব ফয়জুন্নেছার স্বামীর বাড়ি বরুড়া উপজেলার বাকশার গ্রামে। বর্তমানে ধ্বংসের প্রদীপ হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছেন সৈয়দ এনায়েত উল হক চৌধুরী। নবাব ফয়জুন্নেছার দুই মেয়ের মধ্যে বদরুন্নেছা চৌধুরানীকে পশ্চিমগাঁওতে এবং সৈয়দা আসাদুন্নেছা চৌধুরানীকে বিয়ে দেন হবিগঞ্জ জেলার পইল জমিদার সৈয়দ ওয়াসেকুল হকের সঙ্গে। কুমিল্লা শহরে ১৮৭৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা দুটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। শহরের পূর্ব প্রান্তে নাজুয়া দীঘির পাড়ে প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং দ্বিতীয়টি বাদুরতলাতে উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নবাব ফয়জুন্নেছার বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনের দুই বছর পর স্যার সৈয়দ আহম্মদ আলী গড়ে ১৮৭৫ সালে প্রথম মুসলিম কলেজ অ্যাংলো ওরিয়েন্টাল কলেজ পরবর্তী সময়ে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় খ্যাত স্থাপন করেন।
নবাব ফয়জুন্নেছা ছিলেন নারী শিক্ষার অগ্রনায়িকা। অন্ধকার যুগের আলোর দিশারী মহীয়সী নারীর স্মৃতি এখন বহন করছে। নবাব ফয়জুন্নেছা মক্কা শরীফে মুসাফির খানা ও মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন এবং মাওলাতিয়া মাদ্রাসা স্থাপনে তিনি সাহায্য করেন। ১৮৯৯ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্নে নবাব ফয়েজুন্নেছা প্রচুর অর্থ সাহায্য করেন। নবাব ফয়েজুন্নেছা রচিত কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে। মিশ্র ভাষারীতির লেখিকা গদ্য ও পদ্যে তার গ্রন্থ রচনা করেন। রূপজালালের কাহিনী আদিভৌতি কথায় পরিপূর্ণ। লিখিকা ভাষা রীতিতে তত্সম শব্দের ওপর বিশেষভাবে দুর্বলতা প্রকাশ করেন। তার রচনায় মধ্যযুগীয় ও পুঁথি সাহিত্যের প্রভাব ফুটে ওঠে শীমাইল রাজপুত্র জালাল ও রাক্ষস পালিতা সাধুপুত্রী রূপভানুকে কেন্দ্র করে। লাকসামে নবাব ফয়জুন্নেছার বাড়ির পাশে ১০ গম্বুজ মসজিদের পাশে দক্ষিণ পারিবারিক কবরে স্থান নবাব ফয়জুন্নেছা আত্মার নশ্বরদেহ চিরদিনের জন্য সমাহিত রয়েছে। নবাব ফয়েজুন্নেছা আর নেই, আছে তার স্মৃতি, যে স্মৃতি দেখতে এখনও বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন প্রচুর দর্শনাথী। কিন্তু নবাববাড়ির নবাব ভবন রক্ষণাবেক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে আজ ধ্বংস ও বিলীন হওয়ার পথে। দীর্ঘ বছর থেকে এর সংস্কার নেই। নবাব ফয়জুন্নেছার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি ওয়াকেফ দান করা। বর্তমানে প্রচুর সম্পত্তি রয়েছে। নবাব বাড়ি ও সম্পত্তি দেখাশোনার জন্য বংশানুসারে খাদেমের দায়িত্বে রয়েছে সৈয়দ মাসুদুল হক চৌধুরী এবং সৈয়দ কামরুল হক চৌধুরী। বাংলাদেশের গৌরব নারী মহীয়সী নবাব ফয়জুন্নেছার নবাববাড়ি সংস্কার করে সরকারিভাবে হেফাজতে নেয়া প্রয়োজন।

পীর আউলিয়ার মাজারঃ
লাকসামে মহাপুরুষ আধ্যাত্মিক পীর আউলিয়ার আগমন ও স্মৃতি মাজার শরিফ মহাকালের সাক্ষ্য বহন করছে। স্মৃতি মাজার শরীফ আধ্যাত্মিক মহাপুরুষ পৌরশহর গাজীমুড়া হজরত শাহ সৈয়দ করিম সাহেবের মাজার, পশ্চিমগাঁও হজরত সৈয়দ গাজীউল হক সাহেবের মাজার, কালীয়াপুর হজরত কাজীমুদ্দিন কালীয়াপুরী, দক্ষিণ চাঁদপুরে হজরত পীর আলী আশ্রাফ চাঁদপুরী, রাজাপুরে হজরত পীর শাহ ওয়ালী উল্যাহ রাজপুরী, শাকরা হজরত পীর রজ্জব আলী শাকরাপুরী, পুলইয়া হজরত আবুল বারাকাত, (নোয়াখালী হুজুর), ভোগই হজরত শাহ সুফি সৈয়দ আমির উল্যাহ, শরীফপুর হজরত শাহ শরীফ (রা.), পশ্চিমগাঁও মরহুম অধ্যক্ষ আবদুল মজিদ, পোমগাঁও হাবীবউল্লা নূরী, পশ্চিমগাঁও মুড়ি দরগা নামক আধ্যাত্মিক মহাপুরুষের মাজার মাজার রয়েছে। লাকসামে স্মৃতি থাকা পীর আউলিয়ারা আধ্যাত্মিক কর্মকাণ্ডে সমগ্র দেশে তথা নিখিল ভারতেও বহু ভক্ত তৈরি করে প্রসিদ্ধ লাভ এবং ধর্ম প্রচারসহ লাকসাম অঞ্চলকে আলোকিত করেন। প্রত্যেক বছর এসব মাজারে বিরাট ওরস অনুষ্ঠিত হয় এবং দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজার হাজার মানুষ জিকিরসহ নামাজ আদায় করতে আসে।

যোগাযোগঃ
লাকসাম দেশের বৃহত্ উপজেলা। যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত রয়েছে। লাকসাম আসতে হলে ঢাকার সায়েদাবাদ থেকে সুপার ডিলাক্স বিরতিহীন তিশা বাসে বাইপাস লাকসাম আসতে মাত্র আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার পথ এবং সায়েদাবাদ থেকে আল বারাকা এক্সপ্রেস, ঢাকা এক্সপ্রেস, ইকোনো এক্সপ্রেস, শাহী এক্সপ্রেস, জননী এক্সপ্রেস, যাত্রীসেবা এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন বাস রয়েছে। রেল পথে ঢাকার কমলাপুর চট্টগ্রাম, সিলেট, চাঁদপুর, নোয়াখালী, থেকে আসা ট্রেনে আন্তনগর লাকসাম রেলওয়ে জংশন আসা সহজ। কুমিল্লা সদর থেকে, নোয়াখালী, মাইজদী, লক্ষ্মীপুর জেলা সদর থেকে ডিলাক্স বাস লাকসাম আসা-যাওয়া করে থাকে এবং সময় নেয় খুবই কম।

থাকা খাওয়ার ব্যবস্থাঃ
লাকসামে দর্শনীয় স্পটগুলোর বেশির ভাগই পৌর এলাকায়। তাই থাকা ও খাওয়ার জন্য চিন্তা করতে হবে না। লাকসাম বাজার নিরালা হোটেল, আজমীর হোটেল, হোটেল নিউ আজমীর, হোটেল ক্যাফে নুর, হোটেল সোনার বাংলা, হোটেল হানিফ, হোটেল নুরজাহান, আরাফাত হোটেল, লাকসাম হোটেল, হোটেল নূরে-মদিনা, শেরাটন হোটেল, ভাই ভাই হোটেল, সোহাগ হোটেল, খাজা হোটেল এবং জংশন এলাকায় হোটেল গাউছিয়া, হোটেল ক্যাফে, হোটেল আজমীরসহ বেশ কয়েকটি উন্নতমানের খাবার হোটেল রয়েছে। এ ছাড়া থাকার জন্য জেলা পরিষদের ডাকবাংলো, আবাসিক হোটেল লাকসাম প্লাজা, বন্ধু আবাসিক হোটেল, হোটেল ড্রিম আবাসিক, হোটেল নূর আবাসিক, জনতা আবাসিক হোটেল, সুমন রেস্ট হাউসসহ বেশ কয়েকটি থাকার হোটেল রয়েছে। থাকার ইচ্ছা না থাকলে রাতেই ফিরে যেতে পারেন। যাতায়াতের জন্য সারারাত বাস ও ট্রেন আছে।

03 April 2017

লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় : আলোকিত এক বিদ্যাপীঠ

লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় : আলোকিত এক বিদ্যাপীঠ


লাকসাম পৌর শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে তত্কালীন জমিদার অতুল কৃষ্ণ রায় চৌধুরী প্রতিষ্ঠা করেন। তখনই এটি অতুল হাই স্কুল হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পৌর শহর পশ্চিমগাঁও নবাব ফয়জুন্নেসা ও বদরুন্নেছা যুক্ত উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভের পর তত্কালীন জমিদার অতুল কৃষ্ণ রায় চৌধুরী এলাকার শিক্ষার প্রসারে লাকসাম অতুল হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা লাভের কারণে এলাকায় শিক্ষার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। পরবর্তীকালে সরকারের পাইলট স্কিমের আওতায় ১৯৮২ সালে এক কালের অতুল হাই স্কুলের নাম পরিবর্তন হয়ে লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ হয়।

আগের তুলনায় লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে বর্তমানে অনেক পরিবর্তন এসেছে। উন্নয়নের পাশাপাশি লেখাপড়ার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে সর্বমোট শিক্ষক ২৭ জন, কর্মচারী ৬ জন ও অফিস সহকারী ২ জনসহ রয়েছে শক্তিশালী ম্যানেজিং কমিটি। বিদ্যালয়টিতে রয়েছে ৩টি বিজ্ঞানাগার, ১টি পাঠাগার। কম্পিউটার ও কারিগরি শাখায় ইলেকট্রিক ও ইলেকট্রনিক্স বিভাগ চালু  রয়েছে।

SSC, HSC and Other Exam Result Archive


বিদ্যালয়টিতে ড্রামসেট নিয়ে রয়েছে স্কাউট দল। স্কাউট কার্যক্রম বিশেষ বিশেষ অনুষ্ঠানে ভূমিকা রাখে।
বিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও লেখাপড়ার মান উন্নয়নে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষকদের প্রচেষ্টায় ব্যতিক্রমধর্মী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিদ্যালয়টিতে (১) লেখাপড়ার মান উন্নয়ন, নিয়ম-শৃঙ্খলা, অবাঠামোগত সুবিধা-সুসজ্জিত করা হয়েছে। (২) ছাত্রদের জন্য ব্যাচ, টাই নির্ধারিত পোশাক (৩) অভিভাবকরা তার সন্তান সম্পর্কে দৈনন্দিন লেখাপড়ার বিষয়ে জানার জন্য আকর্ষণীয় ও উন্নতমানের ডাইরির ব্যবস্থা। (৪) ছাত্রদের লেখাপড়ার তদারকি দেখতে শিক্ষকদের রাতে ছাত্রদের বাড়ি বাড়ি যাওয়া। (৫) প্রতিদিন সকাল বেলায় নিয়মিত কোচিংয়ের ব্যবস্থাকরণ। (৬) এক বিষয়ের ওপর যেসব ছাত্র ফেল করছে এই রকম ৩শছাত্রকে বের করে দেয়া। (৭) বিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে ছাত্র ভর্তি করানো। (৮) প্রতি বিষয়ে সাপ্তাহিক শ্রেণী পরীক্ষা বাধ্যতামূলক। (৯) প্রতি বিষয়ে পাস নম্বর ৪০ এবং সব বিষয়ে উত্তীর্ণ না হলে উপরের শ্রেণীতে প্রমোশন পাবে না। (১০) বিদ্যালয়ের নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ৩য় শ্রেণী থেকে ৫ম শ্রেণী অর্থাত্ প্রাথমিক শাখা চালু। (১১) বিদ্যালয়ে সপ্তাহে বিতর্ক ক্লাস ও অন্যান্য পাঠক্রমিক কার্যবলীসহ পূর্ণ ৮ ঘণ্টা ক্লাস চালু।
এছাড়া বার্ষিক সিলেবাস প্রদানসহ বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের আয়োজনসহ মেধাবী ও কৃতিত্বপূর্ণ স্থান অধিকারীদের বিশেষভাবে পুরস্কার প্রদানের ব্যবস্থা।

লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে ঢুকেই চোখে পড়ে অনার্স বোর্ড, অনার্স বোর্ডে মেধাবী ও কৃতিত্বের অধিকারীরা স্থান পায়। জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় প্রতি বছর ৮/১০ জন ছাত্র মেধার স্বাক্ষর রাখে। যা দক্ষিণ কুমিল্লার আর কোনো বিদ্যালয়ে নেই। আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় পাসের হার ভালো। এলাকার গরিব ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মেধাবী ছাত্রদের লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে মোঃ শাহজাহান মোল্লা দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নতি ও লেখাপড়ার মান উন্নয়নের দিক থেকে লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় এগিয়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে লাকসাম পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় সুনাম, সুখ্যাতি ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষর রেখে এগিয়ে যাবেএটি সবার কামনা।

20 October 2015

নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা

নারী জাগরণের অগ্রদূত নবাব ফয়জুন্নেছা



বেগম রোকেয়া জন্মের ৪৬ বছর আগে কুমিল্লার লাকসামে ১৮৩৪ সালে ডাকাতিয়া নদীর উত্তর তীরে খান বাহাদুর বাড়িতে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জন্মগ্রহণ করেন  বেগম রোকেয়ার ৭ বছর আগে ১৮৭৬ সালে তিনি রূপ জালালকাব্যগ্রন্থ রচনা করে সে সময় বেশ সাড়া জাগানরূপজালালনামে গ্রন্থটি বাংলা ভাষায় নারী লেখিকার প্রথম প্রকাশিত বইনবাব ফয়জুন্নেছার রূপ জালাল কাব্য গ্রন্থের কপি কুমিল্লায় সংরক্ষিত আছেসংরক্ষিত আছে লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরীর বাংলা বিভাগেবাংলা একাডেমী ১৯৮৩ সালে এ গ্রন্থটি পুনঃ মুদ্রন করেছেএছাড়াও নবাব ফয়জুন্নেছা সংগীত লহরী ও সংগীত সার নামে আরও ২টি গ্রন্থ রচনা করেনউপমহাদেশের একমাত্র মহিলা নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী নারী জগতের উজ্বল নক্ষত্রদানবীর এ মহিয়সী নারী প্রচার বিমুখ ছিলেননারী লেখিকাদের পথপ্রদর্শকও ছিলেন নবাব ফয়জুন্নেছানবাব ফয়জুন্নেছার রূপজালাল কাব্যগ্রন্থ তার স্বামী গাজী চৌধুরীর নামে উত্সর্গ করেননবাব ফয়জুন্নেছার বাবার নাম সৈয়দ আহম্মদ আলী চৌধুরীতার মার নাম আরফান্নেছা চৌধুরানী১৯০৩ সালের অক্টোবর মাসে ও ১৩১০ বঙ্গাব্দের ২০ আশ্বিন নবাব ফয়জুন্নেছা ইন্তেকাল করেন

কথিত আছে, বিয়ের ১৭ বছর পর ১৮৫১ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী জানতে পারেন তার স্বামী হাছান আলী জমিদারের আরেকটি স্ত্রী রয়েছেমহীয়সী নারী নবাব ফয়জুন্নেছা তার সতীন থেকে পৃথক থাকার জন্য সাড়ে ৩ একর জমির উপর তার বিয়ের কাবিনের ১ লাখ ১ টাকা দিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করেনস্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন বাড়িটি নির্মাণ করতে প্রায় ৩ বছর সময় লেগে যায়ব্রিটিশ আমলের সিমেন্ট, রড, চুন ও সুরকি দিয়ে বাড়িটি নির্মাণ করা হয়নারী জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র নবাব ফয়জুন্নেছা অত্যন্ত ধার্মিক ছিলেনতিনি পর্দার আড়াল থেকে এ বাড়িটিতে বসে উপমহাদেশের সব বিচারকার্য সম্পাদন, রাস্তাঘাট, পুল-ব্রিজ, স্কুল-মাদ্রাসাসহ যাবতীয় জনকল্যাণমূলক কাজ পরিচালনা করতেনবাড়ির পাশে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন দশ গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদকালের বিবর্তনে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি নবাব বাড়ি হিসেবে দেশ-বিদেশে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে

ফয়জুন্নেসার আমলে কুমিল্লা জেলার ম্যাজিস্ট্রেট কুমিল্লার লোকদের উপকারার্থে একটি জনহিতকর কাজে হাত দিয়ে সমস্যায় পড়েন। এসময় মানবতাবাদী নবাব ফয়জুন্নেসা চাহিদা অনুযায়ী টাকার একটি তোড়া ইংরেজ ডগলাসকে দান হিসেবে প্রদান করেন। তার এই দানশীলতার কথা মহারানী ভিক্টোরিয়া জেনে মহারানী ডগলাসকে হুকুম করেন তাকে ‘বেগম’ উপাধি দেয়ার জন্য। ফয়জুন্নেসা ডগলাসের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, জমিদার কন্যা ও স্ত্রী হিসেবে অনেক আগেই এই পদবিতে তিনি ভূষিত। পরে মহারানী ঠিক করেন, এই মহৎ মহীয়সী নারীর একমাত্র সার্থক সম্মান ‘নবাব’ উপাধি-ই হতে পারে। রানীর নির্দেশ অনুযায়ী ১৮৮৯ সালে কুমিল্লার নবাব বাড়ির অট্টালিকায় ৩৫ হাজার টাকা ব্যয়ে এই উপাধি দেয়ার উৎসব অনুষ্ঠিত হয়। হিরক খচিত মহামূল্যবান পদক দিয়ে তাকে ‘নবাব’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। বেগম ফয়জুন্নেসা চৌধুরানী পর্দার অন্তরাল থেকে এই উপাধিটি গ্রহণ করেন।

তার জমিদারির ১১টি কাচারির প্রতিটির পাশে বিশুদ্ধ পানির জন্য পুকুর এবং মক্তব ও প্রাথমিক বিদ্যালয় স্থাপন করেনসে সময় তার তত্ত্বাবধানে নির্মিত বালিকা বিদ্যালয়টি কালের সাক্ষ্য বহন করেছেনবাববাড়ির বালিকা বিদ্যালয়টি কালক্রমে লাকসাম ফয়জুন্নেছা ও বদরুন্নেছা যুক্ত উচ্চ বিদ্যালয় (বিএন হাইস্কুল) রূপ নিয়েছেতত্কালীন মাদরাসা আজ লাকসাম নবাব ফয়জুন্নেছা সরকারি কলেজ হিসেবে এলাকায় আধুনিক শিক্ষার দ্বার উন্মোচন করেছেনবাব ফয়জুন্নেছা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ নির্মাণ কাজেও বিরাট অনুদান প্রদান করেছিলেনকুমিল্লা শহরে ১৮৭৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা দুটি বালিকা বিদ্যালয স্থাপন করেনশহরের পূর্ব প্রান্তে নাজুয়াদীঘির পাড়ে প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয় এবং অপরটি বাদুরতলার উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেনতিনি ছিলেন নারীশিক্ষায় অগ্রণি ভূমিকা পালনকারীলাকসামে নবাব ফয়জুন্নেছা তার বাড়ির পাশে দশগম্বুজ মসজিদ স্থাপন করেনমসজিদের দক্ষিণে পারিবারিক কবরস্থানে নবাব ফয়জুন্নেছাকে চিরদিনের জন্য সমাহিত করা হয়নারীর স্বাস্থ্য সেবায় ১৮৯৩ সালে নবাব ফয়জুন্নেছা কুমিল্লা জেনারেল হাসপাতালে মহিলা ওয়ার্ড স্থাপন করেনএছাড়াও লাকসামে দাতব্য চিকিৎসাকেন্দ্র, ব্রীজ, কালভার্ট ও মসজিদ নির্মাণ করে একজন দক্ষ দানবীর নেত্রীর ভুমিকা রাখেন। 

১৮৯৪ সালে তিনি পবিত্র হজ পালনের জন্য মক্কা গমন করেন। সেখানে গিয়েও তিনি অনেক দান করেন এবং মক্কা শরীফে একটি মুসাফিরখানা প্রতিষ্ঠা করেন। যা এখনো বিদ্যমান। মক্কাশরীফ থেকে এসে পরিবার-পরিজনদের জন্য সামান্য কিছু সম্পত্তি রেখে বাকি সমস্ত সম্পত্তি আল্লাহর নামে ওয়াকফ করে দেন। সম্পত্তি ওয়াকফ করার পর তিনি বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মক্তব ও হাসপাতাল নির্মাণে অনেক টাকা দান করেন। তার ব্যক্তিগত দৈনন্দিন দিনযাপনের তালিকাতেও অনেককিছুু শিক্ষণীয় বিষয় রেখে গেছেন আমাদের জন্য। যদিও তার স্বামী মোহাম্মদ গাজী নবাব ফয়জুন্নেসার সঙ্গে ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়েছিলেন কিন্তু তিনি একজন উচ্চবংশীয় জমিদার ও সুরুচির অধিকারী মানুষ ছিলেন। বেগম ফয়জুন্নেসা দুই কন্যা সন্তানের জননী ছিলেন। তার দু’কন্যার নাম আসাবুন্নেসা ও বদরুন্নেসা। এই মহীয়সী নারী ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯০৩ খ্রীস্টাব্দ ইহলোক ত্যাগ করেন। একুশে পদক প্রদানের মধ্যে দিয়ে তার অসীম কাজের স্বীকৃতি দেয়া হয়েছিল

নবাব ফয়জুন্নেছার উত্তরাধিকারী ওয়ান ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফজলে রহমান চৌধুরী আয়াজ জানান, ঐতিহ্যের ধারক লাকসামের নবাববাড়ি দক্ষিণ এশিয়ার সৌন্দর্যমণ্ডিত বাড়িগুলোর মধ্যে অন্যতমবর্তমানে অযত্নে-অবহেলায় বাড়িটির সৌন্দর্য দিন দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছেএভাবে চলতে থাকলে একপর্যায়ে বাড়িটির ঐতিহ্য বিলুপ্ত হয়ে যাবেবাড়িটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া একান্ত প্রয়োজনবাড়িটিতে নবাব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানীর স্মৃতি সংরক্ষণ করে জাদুঘর করা হলে বাড়িটি হতে পারে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম দর্শনীয় স্থান

লাকসাম নবাব বাড়ির বর্তমান অবস্থাঃ