25 January 2016

কুমিল্লায় তীব্র গ্যাস সংকট


নিজস্ব প্রতিবেদকঃ গ্যাস নগরী কুমিল্লায় চলছে তীব্র গ্যাস সংকট। দেশের অন্যতম বৃহৎ বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেডের অধীন হাজার হাজার আবাসিক ও বানিজ্যিক গ্রাহক এঅবস্থায় চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে।
নগরী সহ জেলার বিভিন্নস্থানে আবাসিক সংকটের ফলে দিনভর চূলায় আগুণ জ্বলছে না। এতে করে অপেক্ষাকৃত বিত্তবানরা বিকল্প জ্বালানী হিসেবে সিলিন্ডার সহ অন্রান্য জ্বালানী ব্যবহার করতে পারলেও সাধারন মানুষ চরমভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছ্। এঅবস্থা বেশ কিছুদিন ধরে চললেও বাখরাবাদ কর্তৃপক্ষ রয়েছে নিরব।
অভিযোগ রয়েছে বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড’র এক শ্রেনীর দূর্নীতিপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী,সিবিএ নেতার যোগসাজশে প্রতিষ্ঠিানটির ঠিকাদাররা নগরী সহ জেলার বিভিন্স্থানের প্রভাবশালীদের সহায়তায় মহানগরী সহ জেলার প্রায় সর্বত্র অবৈধভাবে হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ দেওয়ার ফলে সরবরাহের ঘাটতির কারণে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। তবে এরই মাঝে কিছু কিছু স্থানে অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ করা হলেও সেটা সামান্য হওয়ার কারনে সংকট থেকেই যাচ্ছে। আর এতে বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস সংকটের কবলে পড়ে দূর্ভোগের শিকার হচ্ছে প্রতিদিন।
সরেজমিন মহানগরী ও জেলার বিভিন্নস্থান ঘুরে স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বিগত ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সরকার সারা দেশের ন্যায় কুমিল্লাতেও আবাসিকখাতে গ্যাস সংযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়ে।
এরপর থেকেই বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড’র দায়িত্বশীল উর্ধ্বতন কিছু অসাধূ কর্মকর্তার যোসাজশে কিছু অসাধূ কর্মচারী,সিবিএ নেতাদেও ম্যানেজ করে প্রতিষ্ঠানটির ঠিকাদাররা নগরী ও এর আশপাশের এলাকা সহ পুরো জেলায় প্রভাবশালী লোকদের দিয়ে গ্যাস সংযোগের জন্য হাজার হাজার গ্যাস সংযোগ প্রত্যাশী লোকদের প্রলোভন দেকায়। পরে তাদের কাছ থেকে সর্বনিম্নে ৫০ হাজার থেকে সর্বোচ্চ সোয়া লাখ টাকা কওে নিয়ে  নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না কওে অবৈধ সংযোগ প্রদান শুরু করে। অবৈধ সংযোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঠিকাদাররা দেশের পাইপলাইন খ্যাত জাতীয় প্রধান ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের নীচ দিয়ে কখনোবা নদীর উপওে থাকা ব্রীজের পথচারী পারাপারের অংশের স্ল্যাব সরিয়ে এই সংযোগ প্রদান করে। এছাড়াও অবৈধ এই সংযোগে নিন্মমানের সামগ্রী ব্যবহারের কারনে চরম ঝুঁকিপূর্ণ রয়েছে গ্যাস সংযোগ লাইন। যে কোন মুহুর্তে ঘটে যেতে পাওে ভয়াবহ দুর্ঘটনা।
সুত্র জানায়, অবৈধ সংযোগ বানিজ্যে কুমিল্লার হোমনা, তিতাস, দাউদকান্দি, চান্দিনা, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, বুড়িচং, বরুড়া, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, কুমিল্লা সদর, সদর দক্ষিণ উপজেলা ছাড়াও মহানগরীর বিভিন্ন এলাকা রয়েছে।
বর্তমানেও জেলার বিভিন্নস্থানে অবৈধ সংযোগ টানা হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়, ঠিকাদার সহ অবৈধ গ্যাস সংযোগ দেওয়া সিন্ডিকেটের সদস্যরা গ্রাহকদেও প্রতারিত করতে কোন কোন স্থানে ভূয়া গ্যাসের বিল বই ছাপিয়ে তাদের সরবরাহ করে। এক্ষেত্রে ওই প্রভাবশালী প্রতারকরা ব্যাংকের কাগজপত্রে ভূয়া সীল মেরে ডিমান্ড নোট বানিয়ে প্রতারনার আশ্রয় নেয় বলে অভিযোগ আছে।
এদিকে সারা জেলা জুড়ে যখন অবৈধ গ্রাস সংযোগ বানিজ্যেও রমরমা বানিজ্য চলছে তখন সাধারন মানুষ নামে-বেনামে বিভিন্নভাবে বাখরাবাদেও উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করে। তবে অজ্ঞাত কারনে সে অবৈধ সংযোগ বন্ধে সংশ্লিস্ট প্রশাসন কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেনি।
আর এভাবে হাজার হাজার অবৈধ সংযোগের ফলে সরবরাহের তুলনায় গ্রাহক অতিরিক্ত হয়ে পড়লে দিন দিন সংকটের কবলে পড়ে আবাসিক ও বানিজ্যিক গ্রাহকরা। বিগত ৪/৫ মাস পূর্বে থেকে এই সমস্যা শুরু হলেও কিছুদিন ধওে এই সংকট তীব্র থেকে তীব্রতর। ফলে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কুমিল্লা মহানগরীর বিভিন্নস্থানে গ্যাস সরবরাহ একপ্রকার বন্ধ রয়েছে।
কোন কোন স্থানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস সংকট থাকে। এতে কেউ কেউ রাত জেগে রান্না কওে পরিস্থিতি সামাল দিলেও শীতকালে শিশু-বয়স্কদেও চরম খাবার সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। জ্বালানী এই সংকট মোকাবেলায় অপেক্ষাকৃত উচ্চ ও উচ্চ মধ্যবিত্তরা সিলিন্ডার গ্যাস বা কেরেসিনের বিকল্প জ্বালানী ব্যবহার করলেও নিন্ম মধ্যবিত্ত ও সাধারন আয়ের মানুষের দূর্ভোগ চরমে।
জ্বালানী সংকট থেকে উত্তরনে এরইমাঝে নগরীর বিভিন্ন স্থান সহ বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড’র চাঁপাপুর এলাকায় প্রধান কার্যালয়’র সামনে শত শত আবাসিক গ্রাহক বিক্ষোভ, প্রতিবাদ সহ ঝাঁড়– মিছিলও করেছে। এদিকে গ্যাস সংকটের কারনে পুরো জেলা জুড়ে যখন হাজার হাজার আবাসিক গ্রাহকরা প্রতিবাদী হয়ে উঠে তখনই সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা প্রশাসক হাসানুজ্জামান কল্লোলের নির্দেশনায় উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগীতায় জেলার হোমনা, তিতাস, দাউদকান্দি, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, চান্দিনা, বুড়িচং ও সদর উপজেলার কিছুস্থানে অবৈধ সংযোগ লাইন উচ্ছেদ অভিযান চারানো হয়।
এসময় সংশ্ল্টি এলাকার নির্বাহী কর্মকর্তা,পুলিশ ছাড়াও বাখরাবাদেও সংশ্লিস্ট এলাকার দায়িত্বশীল কর্মর্তারা উপস্থিত ছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র আরো জানায়, অবৈধ সংযোগকারীরা যখন হোমনা, তিতাস, দাউদকান্দি, চান্দিনা, বুড়িচং, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, বরুড়া, লাকসাম, চৌদ্দগ্রামে অবৈধ সংযোগ দিতে দিনে-রাতে কাজ করতো সেসময় সাধারন মানুষ মোবাইল ফোনে ওই সকল এলাকার দায়িত্বে থাকা বাখরাবাদ গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানী লিমিটেড’র সাব অফিসের কর্মকর্তাদেও বিষয়টি অবহিত করলেও তারা অজ্ঞাত কারনে নিরব থাকে।
এতে করে অবৈধ সংযোগ দেওয়া সিন্ডিকেট হাজার হাজার অবৈধ সংযোগ দিয়ে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়। বাখরাবাদেও দূর্নীতিপরায়ন কর্মকর্তা,কর্মচারী সহ সিবিএ নেতাদেও একটি অসাধূ অংশ শুদুমাত্র অবৈধ সংযোগ বানিজ্যেই ব্যস্ত না, তারা দেশের প্রধান জাতীয় মহাসড়ক ঢাকা-চট্রগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লা অংশের দু’পাশে চালু থাকা সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও অবৈধ গ্যাস সংযোগ বা মিটার টেম্পারিং কওে প্রতিমাসে কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
বিগত ২০১৫ সালে বাখরাবাদেও অধীন মহাসড়কের পাশে থাকা কমপক্ষে ১১ টি ফিলিং স্টেশনের বিরুদ্ধে মিটার টেম্পারিং’র অভিযোগ উঠলেও সেটার কোন ব্যবস্থাও নেয়নি কর্তৃপক্ষ। এতে জনগনের ভোগান্তির পাশাপাশি রাষ্ট্রও বিপুল অংকের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
তাছাড়া কিছু কিছু স্থানে অবৈধ সংযোগ তোলার কাজ শুরু হলে সংযোগ নেওয়া সাধারন মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে। এদিকে অবৈধ সংযোগ দেওয়া সিন্ডিকেট’র লোকজন এসকল গ্রাহকদেও সংযোগ বৈধতার আশ্বাস দিলেও বর্তমানে গ্রাস সংকট শুরুর পর তাদেরও নাগাল পাচ্ছেনা সাধারন ওই গ্রাহকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দায়িত্বশীল সুত্র আরো জানায়, অবৈধ সংযোগ বানিজ্যেও বিষয়টি রাস্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানাজানি হলে কিছুদিন আগে ঢাকা থেকে স্পেশাল ভিজিল্যান্স টিম অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদে কুমিল্লায় আসার কথা ছিল। কিন্তু অসাধূ ওই প্রভাবশালী চক্রটি নানাভাবে দেনদরবার করে সেটা ঠেকাতে চেস্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বর্তমানে কুমিল্লা মহানগরী, আশপাশের এলাকা সহ বিভিন্ন উপজেলায় গ্যাসের সংকটে থাকা স্থানগুলো হচ্ছে, তালপুকুরপাড়, ঠাকুরপাড়া, অশোকতলা, রানীরবাজার, টমসমব্রীজ, শাকতলা, আশ্রাফপুর, নোয়াগাঁও, চর্থা, উনাইসার, রামনগর, কচুয়া, জাঙ্গালীয়া পিডিবি কলোনী, শ্রীবল্লভপুর, শ্রীমন্তপুর, উত্তর রামপুর, হিরাপুর, মস্তাপুর, ময়নামতি সেনানিবাস সংলগ্ন নিশ্চিন্তপুর, আমতলী, তেতুইয়ারা, মনাগ্রাম, চাঁপাপুর, ঝাকুনিপাড়া, বাজগড্ডা,ঘিলাতলী, হরিপুর, দূর্লভপুর, ভাটকেশ্বও,জোড়ামেহের, নশরাইল, অরণ্যপুর, দাউদেরখাড়া সহ বুড়িচং, চান্দিনা, দেবীদ্বার, মুরাদনগর, দাউদকান্দি, হোমনা তিতাস, বরুড়া, লাকসাম, চৌদ্দগ্রামেও বহুস্থানে তীব্র জ্বালানী সংকট রয়েছে।

শেয়ার করুনঃ

Author:

কুমিল্লা অঞ্চলটি একসময় প্রাচীন সমতট অঞ্চলের অধীনে ছিল। পরবর্তীকালে এটি ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে যোগ দেয়। খ্রিস্টীয় নবম শতাব্দীতে কুমিল্লা জেলা হরিকেল অঞ্চলের রাজাদের অধীনে আসে। অষ্টম শতাব্দীতে লালমাই ময়নামতি দেব বংশ এবং দশম থেকে একাদশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত চন্দ্র বংশের শাসনাধীনে ছিল। ১৭৬৫ সালে এ অঞ্চলটি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অধীনে আসে। ১৭৯০ সালে জেলাটি ত্রিপুরা জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৬০ সালে এর নাম পরিবর্তন করে কুমিল্লা রাখা হয়। ১৯৮৪ সালে কুমিল্লা জেলার অন্তর্গত চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া মহকুমা পৃথক জেলায় পরিণত হয়।

0 facebook: